নাব্যতা সংকট-বিপন্ন নদী,বিপর্যস্ত জীবন

তানজীম আহমেদ:
“নদীর এপারে কহে ছাড়িয়া নিশ্বাস, ওপারেতে সর্বসুখ আমার বিশ্বাস।” আমাদের সেই বিশ্বাস এর জায়গা আজ টলমলে।নাব্যতা সংকটে পড়ে দেশের বেশিরভাগ নদী আজ মৃতপ্রায়। দেশের জন্য অত্যান্ত হতাশাজনক বিষয়টি এখন আশঙ্কাতেও পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশের প্যেক্ষাপট বিবেচনায় নদী একটি অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ন নিয়ামক শক্তি হিসেবে কাজ করে।সহস্র বছর ধরে আমাদের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে নদী অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে।কিন্তু এক সময়ের খরস্রোতা,উত্তাল নদীগুলোর আজ ভগ্নদশা।যেখান দিয়ে কিছু বছর আগেও চলাচল করত বড় বড় নৌযান,সেখান দিয়ে আজ কলাগাছের ভেলা চলতেও হিমশিম খায়।
কিভাবে আমূল বদলে গেলো নদীর এ চিত্র,এমনটা তো হওয়ার কথা ছিলোনা।এই তো সেদিনের কথা ভরাযৌবনা নদী গুলো দ্রুতই মরা খালে রুপান্তরিত হলো।দেশের সর্বত্রই কবি গুরুর সেই কবিতার লাইনের চিত্র “আমাদের ছোট নদী চলে আঁকে-বাঁকে,বৈশাখ মাসে তার হাটু জল থাকে।পার হয়ে যায় গরু পার হয় গাড়ি।দুই ধার উচু তার ঢালু তার পাড়ি”।কবি গুরুর ভাষ্যতে শুধু বৈশাখ মাসেই এমন চিত্র দেখতে পাওয়ার কথা,অথচ বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলে।বর্ষার মৌসুম ছাড়া বাকি সময়টা হাঁটু পানির চেয়েও কম থাকে বেশিরভাগ নদীর পানি।
নাব্যতা সংকট এতটাই তীব্র রূপ ধারন করেছে যে চব্বিশ ঘন্টা ড্রেজিং কার্যক্রম অব্যাহত রেখেও অবস্থার আশানুরূপ উন্নতি সম্ভব হচ্ছেনা।আর ধুঁকতে ধুঁকতে বেঁচে থাকা যে নদীগুলো ড্রেজিং এর তালিকাভুক্ত নয় সেগুলোর অবস্থা একশত বিশ বছরের থুরুথুরে বুড়ির মত।
স্বাধীনতার আগে বাংলাদেশে নদ-নদীর সংখ্যা ছিল সাতশরও বেশি, এখন তা ৪০৫টিতে নেমেছে। বেসরকারি সংস্থাগুলোর তথ্যে নদীর সংখ্যা আরো কমে ২৩০টিতে নেমেছে। ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত মিজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকা’র নদীসংখ্যায় বাংলাদেশে নদীর সংখ্যা ২৩০ থেকে ২৭০টি বলে উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ সাড়ে চার দশকে প্রায় পাঁচ শ নদী মরে গেছে, নদীপথের দৈর্ঘ্য-প্রস্থ উভয়ই কমেছে। নদীর সঙ্গে কমছে নৌপথও। স্বাধীনতাকালে নৌপথ ছিল ২৪ হাজার কিলোমিটার, এখন নেমেছে ছয় হাজার কিলোমিটারে। শীতকালে নৌপথ আরো কমে নামে তিন হাজার ৮২৪ কিলোমিটার।নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্রের এক হিসাবে দেখা গেছে, দেশে লঞ্চ, স্টিমার, কার্গো, ট্রলার, ফেরি নৌকা এবং বার্জের মাধ্যমে বছরে প্রায় ৩০ লাখ টন মালামাল পরিবহন হয়। নৌপথে পরিবহন ব্যয় সড়কপথের চেয়ে অন্তত ২০ গুণ কম হয়।
নদীর যদি মুখ থাকত তাহলে তার আর্তচিৎকারে ভারী হয়ে থাকতো বাংলার আকাশ বাতাস।নদীমাতৃক দেশের অনেক নদী আজ ধূ ধূ মরুভূমির কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।
নদীর উপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে দেশের জনগোষ্ঠীর বড় একটা অংশ।যাদের উপার্জনের প্রধান ও একমাত্র মাধ্যম এই নদী।সেই সব মানুষগুলোর হাহাকার,খাদ্যের অভাবে শিশুদের কান্না, এক অসহনীয় অবস্থার সূষ্টি করেছে।এমনিতেই যেখানে দেশের বেশিরভাগ মানুষ দারিদ্যসীমার নিচে বসবাস করে,দারিদ্যতার নিষ্ঠুর কষাঘাতে জর্জরিত যাদের জীবন ব্যাবস্থা, সেখানে তাদের উপার্জন তথা আশা-ভরসার কেন্দ্র নদীর এ করুণ দশা চেতনার ভিত পর্যন্ত নাড়িয়ে দিয়ে যায়।
এখনও যদি আমরা এই বিষয়ে কার্যকরী কোনো সিদ্ধান্ত তদানুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহনের মাধ্যমে নদী গুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে সচেষ্ট না হই, তবে সেদিন আর বেশি দূরে নয় যেদিন অবশিষ্ট নদী গুলোর নাম শুধু ইতিহাসের পাতাতেই পাওয়া যাবে।
আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সেতু গুলো দেখে হাসা-হাসি করবে, বলবে আগের কালের মানুষ কত বোকা ছিলো, শুঁকনো জায়গার উপরে ব্রিজ বানিয়েছে।
আশা করি সেই দিনটি যেনো কখনোই না আসে। আমাদের জীবন-জীবিকার অপরিহার্য অংশ নদীগুলো যেনো হারিয়ে যাওয়া যৌবন ফিরে পায়, নদীর অভাবে জীবন যেনো বিপর্যস্ত না হয়, আমাদের গৌরব যেনো বিলীন না হয়।