আত্মার কৃতজ্ঞতা

আত্মার কৃতজ্ঞতা
আত্মার কৃতজ্ঞতা

শাহিন কবির, অতিথি লেখক: ছুটিতে বাড়ি রওনা হলাম। সকাল আটটায় স্পীডবোটে করে মংলা ফুয়েল জেটিতে যাই। এই জায়গায় বন বিভাগের বাংলো ও লঞ্চঘাট। স্পীডবোটে করে যাওয়ার সময় যেসব ফরেস্ট স্টেশন ও ক্যাম্প পড়ে সেগুলোতে উঠি এবং দরকারী কিছু কথা বলে সাড়ে ন’টায় ফুয়েল জেটি থেকে প্রাইভেটকারে কাটাখালী আসি। তারপর বিভিন্নভাবে শেষমেষ ঢাকা আসি বিকেল তিনটায়। আমার কর্মস্থল থেকে ঢাকা আসার পথ এতোটা সুগম নয় বলে মাঝখানে কিভাবে আসলাম বললাম না। বাড়ি পর্যন্ত আসতে অনেকসময় চৌদ্দ ঘণ্টাও লেগেছে। এই প্রথম কম সময়ে ঢাকা আসলাম। তাও সম্ভবত শুক্রবার ছিলো বলে। ঢাকা যাত্রাবাড়ি থেকে যথরীতি মদনপুরের বাসে উঠলাম। আমার বাড়ি নারায়ণগঞ্জের আড়ইহাজার উপজেলায়। আড়াইহাজার আসতে আসতে বিকেল। এক বন্ধুর সাথে দেখা করে চা-টা খেয়ে সিএনজি তে করে রওনা হ’লাম। কেনো জানি কী মনে করে কলেজের কাছে নেমে পড়লাম। তখন সন্ধে ছুঁই ছুঁই। কলেজটা আড়াইহাজার থেকে আমাদের বাজারে আসার কাছেই পড়ে। হাজী বেলায়েত হোসেন ডিগ্রি কলেজ। আমি এই কলেজের ছাত্র না হয়েও এই কলেজেই পড়েছি। কারণটা বলি। আমি ঢাকার ধানমন্ডিতে অবস্থিত আইডিয়াল কলেজে ভর্তি হয়েছিলাম। কিন্তু ঢাকা আমার ভালো লাগতো না বলে গ্রামে চলে আসি। গ্রামের এই কলেজে টিসি নিয়ে চলে আসবো ভেবে এখানে ক্লাশ করা শুরু করি। এবং এই কলেজের অঘোষিত ছাত্র হয়ে যাই। পরে অবশ্য ইন্টার ফাইনাল পরীক্ষা আইডিয়াল কলেজ থেকেই দেই। সে অনেক ইতিহাস। অন্য একদিন বলা হবে। তবে এই কলেজের কাছে আমি ঋণী। যাক, কী মনে করে এখানে নেমে পড়লাম এবং খোলা মাঠের ভিতর দিয়ে বাড়ির দিকে রওনা হলাম৷ এখান থেকে আমাদের বাড়ি দেখা যায়। খোলা মাঠ। মাঠের মাঝামাঝি। হঠাৎ অন্ধকার হয়ে গেলো। কিন্তু তখন মাগরীবের আযান চলছিলো পাশাপাশি মসজিদগুলোতে। খোলা মাঠ জনমানবহীন হয়ে গেলো। এইতো কলেজের মাঠ থেকে নামার সময়ও কত লোক দেখলাম তাদের জমিতে শেষ আঁচর দিচ্ছে। কেউ গরুগুলো নিয়ে বাড়ি যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

লেখক

কিন্তু এতো অল্প সময়ের মধ্যে চারপাশে ঘুটঘুটে অন্ধকার নেমে এলো। হালকা কোলাহলপূর্ণ বিশাল মাঠটা একেবারে জনমানবহীন হয়ে গেলো! এই রাস্তা আমার পরিচিত বিধায় অন্ধকারেও সমস্যা হচ্ছিলো না। আযান থেমে গেলো। পশ্চিমে একটা চাঁদ ভেসে উঠলো। চারপাশে হালকা আলোয় ভূতুড়ে পরিবেশ তৈরি হলো। চাঁদটা বেশ বড়ো। গতকালও তো আমার চাঁদপাই অফিসে কাস্তের মতো একটা চাঁদ দেখেছি। একদিনের ব্যবধানে একটা চাঁদ এতো বড়ো হয় কিভাবে! প্রায় আয়তাকার মাঠ। দূরে বাতিগুলো মিটমিট করে জ্বলছে। অদ্ভূতভাবে জ্বলছে ভুইয়াবাড়ির পশ্চিমদিকের বাতিগুলো। একটা উল্কাপিণ্ড আমার ঠিক অদূরেই যেন খসে পড়লো। মুরুব্বিদের কাছে শুনেছি, এসব আলো নাকি অশুভ লক্ষণ। এখান থেকে আমাদের বাড়ি কাছেই। প্রায় আধা কিলো হবে। হঠাৎ, আমার বামপাশে ১০-১৫ গজ দূরে ৮ জন লোক দেখলাম। তারা বিড়বিড় করে কী যেন পড়ছিলো। অন্ধকারে কিছুক্ষণ চলার পরে চোখ অন্ধকার সয়ে গেছে। দেখলাম, একটা খাটিয়া। চারপাশে চারজন লোক। সামনে দুইজন পিছনে দুইজন। কিছুদূর গিয়ে খাটিয়া নামালো।যেখানে নামালো দেখলাম সেখানে আরও জনা চারেক লোক কবর খোঁড়ার বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত। এই মাঠ আমার পরিচিত। গ্রাম আমার। পরিচিত লোক হবে ভেবে বিষয়টা দেখার জন্য এগিয়ে গেলাম। তারা কেউ সম্ভবত আমাকে খেয়াল করেনি। তারা তাদের মতো যে যার কাজ করতে লাগলো। কেউ কারও সাথে কথা বলছে না। কাছাকাছি গেলে তারা আমাকে দেখে কেউ একজন বলে উঠলো, ‘ শাহীন নাকি রে?’ তারপর সবাই নড়েচড়ে উঠলো। আমি ছোট করে কিছু না ভেবেই উত্তর দিলাম, ‘ জ্বী, আমি।’ তারপর তারা আমার থেকে মনোযোগ সরিয়ে কাজ করতে লাগলো। দুইজন লোক কবর খুঁড়তেছে। খাটিয়া ঘিরে বাকি লোকদের ভিড়। আমি তাদের চেনার চেষ্টা করলাম। অন্ধকারে যতটা দেখা যায় তাতে পরিচিত হলে চিনতে পারতাম। কিন্তু কেউ আমার পরিচিত না। আমি খাটিয়াটা দেখার বৃথা চেষ্টা করলাম। তারা এমনভাবে খাটিয়া আড়াল করে রাখলো দেখতে পেলাম না তখন। পরে একজন বৃদ্ধলোক আমার কাছে এসে বললো, ‘ কোথা থেকে এলে এতো রাতে!’ ‘এতো রাতে’ কথাটা আমার কাছে কেমন মনে হলো। এইতো সন্ধে হলো। এতো রাত কোথায়? কিছুক্ষণ আগেই তো মাগরীবের আযান শোনলাম। আমি বললাম, ‘বাগেরহাট থেকে।’ ‘ এতো রাতে এখান দিয়ে আসলে কেন?’ দ্বিতীয়বার কথাটা শুনে আমি কৌতুহলবশত বললাম, ‘এতো রাত মানে?’ দেখলাম, লোকটার চোখ হঠাৎ জ্বলজ্বল করে উঠলো। আমি মোবাইলটা হাতে নিয়ে দেখলাম তখন রাত তিনটে। কলেজে এসেও তো দেখলাম পাঁচটা পঞ্চাশ বাজে। তারপরে মোবাইলটা আর হাতে নেইনি। রাত তিনটে! কী করে সম্ভব! পরিবেশটা থমথমে হয়ে গেলো। কী সব কথা কানে আসতে লাগলো। তাদের কোনো ভাষা আমি বুঝতে পারতেছি না। বাড়ির দিকে যে পা বাড়াবো তাও পারতেছি না। মনে হচ্ছে আমার পা কে যেন টেনে ধরে রাখছে মাটির ভিতর থেকে। মোবাইলটা বারবার দেখতে লাগলাম। নাহ, রাত তিনটেই বাজে। এবার খাটিয়াটা আমার সামনে দিয়ে কবরের কাছে নেয়া হলো। আমি টর্চ জ্বালাতে যাবো এমন সময় ব্যাটারী লো দেখিয়ে মোবাইল অফ হয়ে গেলো। মোবাইলের কথা না ভেবে আমি দেখতে চেষ্টা করলাম কার লাশ এটা। আরও আশ্চর্যের ব্যাপার এই মাত্র খেয়াল করলাম, আর তা হলো, এটা কোনো গোরস্থানও না বা এখানে আগে কোনো কবরও দেয়া হয়নি। জমিটা ভূইয়াদের। ভূইয়াবাড়ির দিকে একনজর তাকালাম। এখন আর বাতিগুলো দেখা যাচ্ছে না। আশেপাশের কোনো গ্রাম থেকেই কোনো বাতির আলো দেখা যাচ্ছ না এখন। আমি লাশের দিকে তাকালাম। আমার ঠিক সামনেই লাশটা। অন্ধকারেও স্পষ্ট দেখলাম করিম ভূইয়ার লাশ। তখন চোখ সব কিছু পরিষ্কার দেখছিলো। লোকগুলো আমার দিকে ফেলফেল দৃষ্টি নিয়ে তাকাচ্ছিলো। আমার এবার মনে হলো, রাত তিনটে। এতো রাতে লাশ দাফন করার জন্য আনা হলো। অথচ এরা কেউ ভূইয়াবাড়ির না। আমার গলা শুকিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। আমি কাঁপা কাঁপা গলায় এবার বলে উঠলাম, ‘আপনারা কারা? করিম কাকা কিভাবে মারা গেলো? ‘ এবার লোকগুলো আমার দিকে বিরক্তি নিয়ে এমনভাবে তাকালো যেন আমি খুব কঠিন একটা প্রশ্ন তাদের দিকে ছুঁড়ে দিয়েছি। সেই বৃদ্ধ লোকটি বললো, ‘ করিম ভূইয়া গতকাল সন্ধায় ঢাকায় সড়ক দূর্ঘটনায় মারা যায়।’ আমি উত্তরটা ঠিক মতো না শুনে বললাম, ‘তো, আপনারা কারা?’ আমি তাদের উত্তরটা ভালো করে খেয়াল করলেই বুঝতে পারতাম যা ঘটছে তা স্বাভাবিক না। বৃদ্ধলোকটি উত্তর দিলো,’ আমরা লাশ কবর দেই। ভূইয়াবাড়ির কেউ জানে না করিম ভূইয়া মারা গেছে।’ আমি কিছু বুঝতে পারছিলাম না। তারা ধরাধরি করে লাশটা যখন নামাচ্ছিলো তখন আমিও ঝুঁকে দেখতে লাগলাম। কবরে লাশটা শোয়ানো হলো। মাথার বাঁধনটা খুলে দেয়া হলো। রাত তিনটে, ঘুটঘুটে অন্ধকার, তারপরেও আমার চোখে এখানের সব কিছু স্পষ্ট দেখছিলাম। লাশের মুখটা থেঁতলে গেছে। কাফনের কাপড়ে ছোপ ছোপ রক্তের দাগ। গোলাপজল ছিটানো হলো। ভাপসা একটা গন্ধ নাকে আসলো। তারা বিভিন্ন দোয়া দরুদ পড়তে আরম্ভ করলো। সামনে কবরে লাশ, আমিও যা পারলাম তাদের সাথে পড়তে লাগলাম৷ দাফন করা শেষ। আমিও কবরে মাটি দিলাম। কবরের শেষ মাটিটুকু আমিই দিলাম। তারপর একটু সরে এসে বৃদ্ধ লোকটি দোয়া ধরলো। আমি সাধারণত দোয়া ধরলে চোখ বন্ধ করে রাখি। দোয়া শেষে চোখ খুলে দেখি আমার আশেপাশে কেউ নেই। লোকটি ‘ আমিন’ বলার সাথে সাথেই তো চোখ খুললাম! তাহলে এতো তাড়াতাড়ি এতোগুলো লোক কোথায় যাবে! আশেপাশের গ্রামের আলো এখন স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ভূইয়াবাড়ির বাতি গুলো তখনও অদ্ভূতভবে জ্বলছিলো। চারপাশে ঠিকই অন্ধকার কিন্তু এখনকার অন্ধকারটা আগেকার অন্ধকারের মতো না। আমার চোখ এখন আর আগের মতো স্পষ্ট দেখছে না। কিন্তু আশপাশটা বুঝতে পারি। যতদূর চোখ দেখে কোথাও লোকদের টিকিটাও দেখা যাচ্ছে না। সেকেন্ডের মধ্যে এতোগুলো লোক কোথায় গেলো — মনে ঐ একই প্রশ্ন জাগছিলো আমার। দেখলাম, কবরটা আমার সামনেই। এতোক্ষণ স্বপ্ন দেখে থাকলেও তো কবরটা তাহলে থাকার কথা না। কিন্তু কবরটা ঠিকই আছে। আমি আর কিছু না ভেবে বাড়ির দিকে পা বাড়ালাম। মোবাইলটা হাতে নিয়ে অজান্তেই টর্চ জ্বালানোর চেষ্টা করলাম। জ্বললো। বেশ চার্জ আছে, ৭৯%। সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার হলো তখন বাজে মাত্র ছ’টা ত্রিশ। এবার আমার শরীর কাঁপতে লাগলো। আর কিছু না ভেবে দ্রুত বাড়িতে গিয়ে উঠলাম। ভিন্ন পথ দিয়ে আসাতে বাড়ির কেউ কিছু বললো না। বলার কথাও না। মাত্র তো সন্ধে গত হলো। আমি বাথরুমে ঢুকলাম। চোখেমুখে ভালো করে পানি দিলাম। চোখ খুললেই এখন সেই দৃশ্য দেখি। তখন এতটুকু ভয় হয়নি। এখন ভয় হচ্ছে। তখন যদি আমি বুঝতে পারতাম এরকম কিছু তাহলে তো সেখানেই চিত পটাং। আমি ফ্রেশ হয়ে বাসার ছাদে গিয়ে মাদুর পেতে বসলাম। ছাদ থেকে ভূইয়াবাড়ি স্পষ্ট দেখা যায়। বাতিগুলো এখনও ঐ একইরকমভাবে জ্বলছে। কিন্তু তাদের বাড়ি থেকে মরাকান্নার কোনো আওয়াজ আসছে না। কেবল কয়েকজন লোক জটলা করে কী যেন বলাবলি করছে। আমি তড়িগড়ি নিচে গেলাম। বিষয়টা পরিষ্কার হওয়া দরকার। আমার আম্মাকে জিজ্ঞেস করলাম ভূইয়াবড়ির ব্যাপারে, ‘করিম কাকা মারা গেছেন কিভাবে?’ আম্মা অবাকদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন, বললেন ‘ তোরে কে বললো মারা গেছে?’ ‘ মারা যায়নি!’ কাঁপা গলায় বললাম। ‘ না, কালকে থেকে কোনো খোঁজ নাই। মোবাইলও নাকি বন্ধ। যে অফিসে কাজ করতো ওখানেও খোঁজ নিছে। কেউ কিছু বলতে পারেনি।’ আম্মা এ কথা বলে রান্নাঘরে চলে গেলেন। আমি বিড়বিড় করে বলতে লাগলাম, ‘ তাহলে আমি কি দেখলাম!’ রাতে আর কাউকে কিছু বললাম না। সারারাত আমার ঘুম হলো না। সকালে উঠে ভূইয়াবড়িতে গেলাম। বিস্তারিত শুনলাম। আম্মা যা বলেছিলেন রাতে তাদের মুখেও তাই শুনলাম। তখন আমি কালকে রাতের কথা তাদের খুলে বললাম। তারা কেউ আমার কথা বিশ্বাস করলো না। আমি তাদেরকে ঐ জায়গায় নিয়ে গেলাম। কিন্তু সেখানে না আছে কোনো কবর না আছে কোনো আলগা মাটি। কেবল একটা জায়গায় আমি হালকা রক্তের মতো কিছু দেখতে পেলাম। তাদেরকে তা দেখালেও আমার কথা বিশ্বাস করলো না। আর বিশ্বাস করার মতোও না। আমি তখন তাদেরকে বললাম, ‘ আমি শুনেছি উনি নাকি সড়ক দূর্ঘটনায় মারা গেছেন। কবর দিতে আসা লোকেরা তাই বলছিলো।’ তারা আমার কথার গুরূত্ব দিলো না। বাড়িতে এসে চুপচাপ বসে রইলাম। যে কদিন বাড়িতে ছিলাম করিম কাকার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। আমার কথা মতো ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালেও খোঁজ নিতে থাকলো।

ছুটি কাটিয়ে কর্মস্থলে চলে আসার পথেই খবর পেলাম ঢাকার একটা হাসপাতালে সড়ক দূর্ঘটনায় নিহত বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে করিম কাকা মর্গে এতোদিন ছিলেন। বাসায় আসতে আসতে রাত হয়ে যায়। খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে যাই। পরের দিন ডিভিশনে যেতে হবে বন অগ্রীম আনতে। ঘুমিয়ে পড়েছি। স্বপ্নে দেখি করিম কাকা আমার পাশে বসা। আমার মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করতে করতে বললেন, ‘ ভাতিজা, তোর কাছে আমি কৃতজ্ঞ।

শাহিন কবির, অতিথি লেখক