শাহিনার সংসার

সুব্রত কুমার মুখার্জী

শাহিনার বর বেলাল। কয়েক মাস আগে বিয়ে হয়েছে। বিয়ে বলা যাবে না শাহিনা চলে এসেছে। শাহিনা বেলালের মধ্যে ভালবাসা বলতে গেলেও বলা যায় না তা তাদের হয়েছিল। তবে দুইজনকে দুইজনার ভাল লাগত। শাহিনা ধনী পরিবারের মেয়ে না হলেও উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে। বাবা দেশ রক্ষার মন্ত্রে নৌবাহিনীতে কাজ করেন। বাবার চাকরীর কারনে চিটাগাঙে জন্ম হয় শাহিনার। বাবার সাথে রোজ দেখা না হলেও মাঝে মাঝে আসতেন আদর করতেন আর অনেক খেলনা। শাহিনা বড় হতে লাগল আর বাবার আচরন দেখে মনে হতে বাবা কি তার নিজের। বাড়িতে এসেই বিদ্যালয়ের দেওয়া ফলাফল শীট দেখে রেগে যেতেন। শাহিনা ক্লাসে প্রথম না হলেও এতই খারাপ ছিল না যে এর জন্য তাকে শাস্তি পেতে হয়। এরই মাঝে বাবা জাতিসংঘের মিশনে চলে যাওয়ায় শাহিনা তার মায়ের সাথে ফিরে এল বাড়িতে। মোড়েলগঞ্জের এক অজ পাড়াগায়ে তাদের বাড়ি। চিটাগাঙে থাকতে কাদা দেখেনি। এখন তাদের বাড়িতে যেতে গাড়ি যেন নাগরদোলা। কখনও মনে হয় ধানের মাঠের মধ্যে চলে যাবে আবার কখনও পানিতে। নাগরদোলায় দুলতে দুলতে দৈবজ্ঞহাটি বাজারে নামল। বাজার থেকে আরও অনেক দূরে বাড়ি। মটর বসান ভ্যানে বাক্স পেটরা নিয়ে উঠে পড়ল শাহিনা আর তার মা। শাহিনার নানা একটি ভ্যান নিয়ে বসেছিলেন। বোঝা যাচ্ছিল এই ভোর বেলায় আসতে তার বড়ই কষ্ট হয়েছে। হাপানির কষ্টে কথা বলতে কষ্ট হয়। শাহিনারা এক সময় পৌছাল বাড়িতে। জন্মের পরে এই বাড়িতে আসা। বাবাও কখনও বাড়িতে আসার কথা বলত না।

লেখক

চাকরির টাকা নিয়মিত নানাকে না পাঠানয় এ নিয়ে মনকষাকষির এক পর্যায়ে বাবা বাড়ির সাথে কোন যোগাযোগ রাখত না। শাহিনা বাড়ি পৌছে অবাক। চারিদিক কাদা। তার মাঝখানে একটি বাড়ি। ঘরের চাল একধরনের পাতা দিয়ে ছাওয়া। মায়ের কাছে জানল এ নাকি গোল পাতা। ঘরের চারিপাশে হাস, মুরগী, গরু, ছাগলের পায়খানায় কাদার সাথে একাকার। জুতা হাতে খুলে ঘরে ঢুকতে হল।

বাড়িতে কয়েকদিন থাকতে থাকতে অসহ্য হয়ে গেল শাহিনার। এরই মধ্যে মায়ের কাছে আকুতি মিনতী করে বাগেরহাট শহরের পিসি কলেজে লেখাপড়া করার জন্য ভর্তি হল। কিছুদিন যেতে না যেতে বাবা ফিরে এল বাড়িতে। স্বেচ্ছায় অবসর। এতদিন চাচারা নানার সাথে খারাপ ব্যাবহার করত। এখন বাবা আসায় আরও খারাপ অবস্থা হল। শাহিনার সারাক্ষণই মনে হয় এ লোকটি তার মায়ের স্বামী নয়, নানার ছেলে নয়, চাচাদের ভাই নয় আর তার বাবা নয়।

মোবাইলের টাকা দেওয়া নেওয়ার মাঝে শাহিনার সাথে বেলালের পরিচয়। বয়সের ব্যাবধান বেশ হলেও শাহিনার বেলালকে ভাল লাগত তবে তা ভালবাসা নয়। এরই মাঝে শাহিনার গায় হাত তুলল তার বাবা। মনের দু:খ গুলো বেলালকে বলে একসময় শাহিনা বেলালকে বিয়ে করতে বলল। বেলালও রাজি। শাহিনা বেলালের বিয়ে হল। কয়েকদিন শাহিনা তার বান্ধবীর বাড়িতে থাকল। বাবা থানায় কেচ করল। শাহিনার বিয়ের বয়স হওয়ার কারনে থানা আর এ বিষয় নিয়ে এগোল না। তবে তার কলেজের বন্ধুদের সাহায্য না হলে অনেক কিছুই হতে পারত।

শাহিনা শ্বশুর বাড়িতে গেল। বাড়িতে পা দিতেই এক অশান্ত পরিবেশ। শাশুড়ীর বিশবানে জর্জরিত শাহিনা। শ্বশুর কোন কথা না বলেও দুই ননদ সারাক্ষণই তার শরীর বিভিন্ন অংশ নিয়ে বিকৃত ভাবে আলোচনা করছে। শাহিনা বুঝতে পারল তার এখানেই থাকতে হবে। দুই দুইটি দেওর। শাহিনা সেই ভোরে উঠে। ছোট দেওর চাকরী করে, তার জুতা পালিশ করে রাখতে হয়। মেঝ দেওর দোকানে যায় তার জামা, লুঙ্গি রোজ কাচতে হয়। তবে শাশুড়ীর একটাই কথা রান্নাঘরে ঢুকতে পারবে না।

প্রতিবেশীদের বিভিন্ন বাঁকা কথায় শাহিনাল সন্ধেহ হয়। এরই মাঝে শাহিনার শাশুড়ীকে এক প্রতিবেশী বলেছিল এ বউ কতদিন থাকবে। শাহিনা বুঝতে পারে না। বেলালের রুম গোছাতে গোছাতে শাহিনা খুজে পায় তার বরের ১ম বউয়ের সাথের তালাকনামা। সারাদিন কিছুই খেতে পারে না শাহিনা। কয়েকবার ভেবেছে এ বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে, কিন্তু কোথায় যাবে।

বাবার বাড়ির পথতো তার চিরদিনের মত বন্ধ। শাহিনা নিজেকে শান্ত করে। রাতে বেলালকে জিজ্ঞাসা করে তুমি আমার সাথে এই মিথ্যা কেন বললে। বেলাল শাহিনাকে বলে এ এক বানোয়াট মিথ্যা কেচ। শাহিনা তার রাগ সামলাতে পারে না, বেলালের মুখের উপর চর মেরে দেয়। সারারাত না ঘুমিয়ে কেঁদে চলে। বেলাল খাটের উপর ঘুমিয়ে আছে। সকাল হতে শাহিনা বেলালকে বলে তোমাকে আমি ক্ষমা করে দিলাম।

সকলের প্রতি লক্ষ্য রাখা আর ভালবাসায় শাহিনা শ্বশুর বাড়ির সবার মন জয় করে নেয়। এরই মধ্যে তালাক নামার সাথে আরও অনেক চিঠি আর ছবি খুজে পায় শাহিনা। সব দেখে বুঝতে পারে বেলাল এর আগে কয়েকবছর প্রেম করে বিয়ে করেছিল। কলেজের বন্ধুদের প্রচেষ্টায় বেলালের আগের বউয়ের সাথে দেখা করে শাহিনা। জানতে পারে শ্বাশুরী, দেওর আর ননদদের অত্যাচারে তালাক দিয়েছে সে বেলালকে। আর একই সাথে বিয়ের পর বেলালের উদাসীনতা। শাহিনা বুঝতে পারে যে অত্যাচার তার উপর হচ্ছিল একই রকম হয়েছিল এই মহিলার উপর। এই মহিলা তাদের অত্যাচার সহ্য করতে না পারা, মানিয়ে নিতে না পারায় তালাক দিয়েছিল। মহিলার বাবার  বাড়ি ছিল, কিন্তু শাহিনা, তার তো যাওয়ার জায়গা নেই তাই সে সব মানিয়ে নিয়েছে।

লেখক-উন্নয়ন কর্মী