মনোযোগ সম্পর্কে কিছু কথা

অভিজিৎ দাস: মনোযোগ প্রত্যক্ষণের সাথে সরাসরি জড়িত একটা গুরুত্বপূর্ণ মানসিক প্রক্রিয়া। ব্যক্তির প্রত্যক্ষণ,শিক্ষন, চিন্তন ইত্যাদি মানসিক প্রক্রিয়া গুলো মনোযোগের মাধ্যমে সুচারুভাবে সম্পন্ন হয়।সাধারণ কথায় বলা যায় মনোযোগ ব্যক্তির ইচ্ছার একটা বিশেষ রূপ। মনোযোগের সহজ এবং সর্বজনগ্রাহ্য সংজ্ঞা প্রদান করা বেশ কঠিন কাজ। বিভিন্ন মনোবিজ্ঞানী বিভিন্ন ভাবে এর সংজ্ঞা দিয়েছেন। মনোবিজ্ঞানী ড্রেভার বলেছেন,”Attention is certain type of mental state,which has selective power and which is active by itself. ” মনোবিজ্ঞানী J.P. Gilford এর মতে,” মানুষ যা পর্যবেক্ষণ করতে চায় তা নির্বাচনের মানসিক প্রক্রিয়াই হচ্ছে মনোযোগ। “এখানে স্পষ্ট ভাবে বোঝা যাচ্ছে এক্ষেত্রে ব্যক্তির ঐচ্ছিক ব্যাপারটি বিশেষভাবে যুক্ত। মনোযোগ নির্ভর করে কতগুলো বিশেষ পরিস্থিতির উপর। কোনো বস্তু বা বিষয়ে মনেযোগ স্থাপনের ক্ষেত্রে কতগুলো শর্ত বিশেষ ভূমিকা পালন করে। এই শর্তগুলো প্রধানত দুই প্রকার -(ক)মনোযোগের বস্তুনিষ্ঠ শর্তাবলি (খ)মনোযোগের ব্যক্তিনিষ্ঠ শর্তাবলি।

(ক)মনোযোগের বস্তুনিষ্ঠ শর্তাবলী:

বস্তুনিষ্ঠ শর্তগুলোকে ব্যক্তি নিরপেক্ষ, বাহ্যিক বা বস্তুগত শর্তও বলা যেতে পারে।এরূপ কয়েকটি শর্ত-

১। আকার:দুটি উদ্দীপকের ভেতর তুলনামূলক বড় উদ্দীপকটি মনোযোগ বেশি আকৃষ্ট করে।যেমন:পাশাপাশি অবস্থানরত ছোট ভবনটির চেয়ে বড় ভবনটি সহজেই চোখে পড়ে।

২।তীব্রতা: অধিকহারে তীব্রতাসম্পন্ন উদ্দীপকের ওপর সহজেই মনোযোগ আকৃষ্ট হয়। যেমন যে শব্দের তীব্রতা বেশি তার দিকে মনোযোগ বেশি আকৃষ্ট হয়।

৩।পুনরাবৃত্তি: কোনো ঘোষনা পাঠ করার সময় গুরুত্বপূর্ণ অংশটি বার বার পুনরাবৃত্তি করা হয়।কারন পুনরাবৃত্তি মনোযোগ আকর্ষন করে।

৪।গতিশীলতা:গতিশীল বস্তুু বিশেষ করে হঠাৎ গতিশীল হওয়া বস্তু বেশি মনোযোগ আকর্ষণ করে।

৫।নির্দিষ্ট স্থায়ীত্ব : বেশিক্ষণ উপস্থাপনের ফলেও কোনো উদ্দীপক মনোযোগ আকর্ষণ করে।তবে তা মাত্রাতিরিক্ত হয়ে গেলে বিরক্তির উদ্রেক ঘটে।

৬।বৈপরীত্য : অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া কোনো উদ্দীপকের ঠিক বিপরীত বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন উদ্দীপক উপস্থাপন করলে তা সাথে সাথে ব্যক্তির মনোযোগ কেড়ে নেয়। উদাহরণস্বরূপ- সাদা পোশাক পরা একদল ছাত্রের মধ্যে কালো পোশাক পরা কারো উপস্থিতি মনোযোগ কেড়ে নেয়।

৭।রঙিন বস্তু: সাদা কালো উদ্দীপকের তুলনায় রঙিন উদ্দীপক মনোযোগ কেড়ে নেয়।রঙের প্রতি আকর্ষন একটা সহজাত স্বভাব।বিশেষ করে লাল রঙের প্রতি অাকর্ষন বেশি হয়।

৮।উজ্জ্বলতা : বেশি উজ্জ্বল বস্তু বেশি তাড়াতাড়ি মনোযোগ কেড়ে নেয়।মনোযোগের শর্ত হিসেবে উজ্জ্বলতাকে গণ্য করা হয়।

৯।সামঞ্জস্যহীনতা: সাংস্কৃতিক রুচির সাথে সামঞ্জস্য নাই এমন বস্তু আমাদের মনোযোগ আকর্ষন করে।যেমন -ফেরিওয়ালাদের খাপছাড়া পোশাক।

১০।গোপনীয়তা:গোপনীয় বা রহস্যাবৃত্ত কোনো বস্তু সহজেই মনোযোগ আজর্ষণের কারন হয়ে দাড়ায়।

১১।অপ-প্রত্যক্ষণ:কোনো ঘটনাকে অল্প সময়ের জন্য উপস্থাপন করা হলেও তা মনোযোগ আকর্ষন করে।টিভি বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে এরূপ চিত্র দেখা যায়।এটা এক ধরনের অতৃপ্তি। যার প্রতি মনোযোগ বেশি আকৃষ্ট হয় মূল তৃপ্তি লাভের প্রত্যাশায়।

১২।অবস্থান: এক সারিতে দাড়ানো অনেক লোকের মধ্যে যিনি মাঝখানে দাড়ানো তার দিকেই প্রথমে দৃষ্টি যায়।চিত্রটি পটভূমির কোথায় আছে তা মনোযোগের জন্য একটি শর্ত।

১৩।আকস্মিকতা: আকস্মিক ভাবে কোনো উদ্দীপক উপস্থাপিত হলে তার ওপর মনোযোগ নিবদ্ধ হয়।একারনেই আকাশে বিদ্যুত চমকানোর দিকে মনোযোগ আকৃষ্ট হয়।

(খ)মনোযোগের ব্যক্তিনিষ্ঠ শর্তাবলী:

ব্যক্তিনিষ্ঠ শর্তকে অভ্যন্তরীণ শর্ত বা মনস্তাত্ত্বিক শর্তও বলা হয়। এই শর্তগুলো ব্যক্তিভেদে,জাতিভেদে আলাদা আলাদা হতে পারে।এগুলো হলো-

১।প্রেষণা: যে বিষয়ের প্রতি ব্যক্তির বিশেষ প্রেষণা কার্যকরী রয়েছে সে বিষয়ে তার মনোযোগ সহজে আকৃষ্ট হয়।যেমন-ক্ষুধার্ত লোকের মনোযোগ খাদ্যের প্রতিই স্থাপিত হয়।এখানে মনোযোগ অনেকটা শারীরবৃত্তীক বিষয়ের সাথে সম্পৃক্ত।

২।আবেগ: আবেগ একটি তীব্র মানসিক অবস্থা। আবেগপ্রবণ অবস্থায় ব্যক্তির মনোযোগ আবেগীয় বিষয়ের প্রতি স্থাপিত হয়।যার প্রতি ভালোবাসা আছে তার বিভিন্ন আচরনই মনোযোগ আকর্ষণ করে।

৩।অভ্যাস ও শিক্ষা : শিক্ষনের দ্বারা সৃষ্ট অভ্যাস মনেযোগ আকর্ষনে সাহায্য করে।গাড়ি চালানোর সময় গাড়িতে বসা অন্য সকলের চেয়ে চালকের মনোযোগ সংকেত বাতির দিকে নিবিষ্ট হয়।

৪।আগ্রহ : কবিতা প্রেমিকরা কবিতার দিকে মনোযোগ দেয় কারন এতে তাদের আগ্রহ থাকে।ব্যবসায়ীর মনোযোগ কবিতার দিকে থাকেনা।আগ্রহ মনোযোগ তৈরি করে।

৫।মনোভাব: যাকে আমরা ভালোবাসি তার ওপর যেমন সহজে মনোযোগ আকৃষ্ট হয়।তেমন যাকে ঘৃণা করি তার ওপরো মনোযোগ নিবিষ্ট হয়।মনোযোগ আকর্ষনের দুটি প্রান্ত এখানে দৃষ্টিগোচর হয়,একটি ধনাত্মক আরেকটি ঋণাত্মক।

৬।সহজাত প্রবৃত্তি : মনোযোগের ব্যাপারটা অনেক ক্ষেত্রেই সহজাত প্রবৃত্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। যেমন-গর্ভাবস্থায় মায়ের দৃষ্টি শিশুদের দিকে আকৃষ্ট হয়।হাসের বাচ্চার দৃষ্টি পানির প্রতি নিবিষ্ট হয়।

৭।স্বাস্থ্যগত অবস্থা : ব্যক্তির মনোযোগ তার শারিরীক ও মানসিক অবস্থার ওপরেও নির্ভর করে।শারীরিক বা মানসিক অসুস্থ হলে অন্য বিষয়ের প্রতি মনোযোগ আনা কঠিন হয়ে দাড়ায়।যেমন-রোগীর দৃষ্টি সবসময় ডাক্তার এবং ওষুধ এর দিকে নিবদ্ধ থাকে।

৮।কামনা: আমরা যা কামনা করি মনোযোগ সেসব বিষয়ের ওপর কেন্দ্রীভূত হয়।যেসব লোক চাকরি খোজে তাদের মনোযোগ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির দিকেই বেশি আবদ্ধ থাকে।এটা প্রয়োজনের সাথে সম্পর্কিত।

৯।মূল্যবোধ:পারিবারিক, সামাজিক, ধর্মীয় মূল্যবোধ মনোযোগ আকর্ষনে প্রভাব বিস্তার করে।যারা অধিক ধার্মিক তাদের ধর্ম সংক্রান্ত বিষয়ে মনোযোগ বেশি আকর্ষিত হয়।

১০।অবসাদ : মনোযোগের ক্ষেত্রে শারীরিক ও মানসিক অবসাদ একটি বড় বাধা।এ শর্তটি ঋণাত্মক শর্ত হিসেবে কাজ করে যা উপরোক্ত শর্তগুলো থেকে উল্টো ধরনের। এই শর্তগুলো কখনো আলাদা ভাবে আবার কখনো দলবদ্ধ ভাবে মনোযোগ স্থাপনে নিয়োজিত থকে।