একরাতে ৩০ কোটি টাকার চিংড়ির ক্ষতি, চাষিরা দিশেহারা

শহিদুল ও তানজীম ফকিরহাট থেকে ফিরে।
একমাত্র আয় উপার্জনের মাধ্যম চিংড়ি চাষ। হঠাৎ বৃষ্টিতে ঘেরের পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়ায় চিংড়ি মারা যাওয়ায় সহায় সম্বল টুকু হারিয়ে আশির উর্দ্ধো দম্পতি পুতুল রানী ও খগেন্দ্র রায় নির্বাক হয়ে বসে আছে চিংড়ি ঘেরের পাড়ে। শুধু এই দম্পতি নয় বাগেরহাটের ফকিরহাটের হাজার হাজার চিংড়ি চাষী তাদের সহায়সম্বল টুকু হারিয়ে এখন দিশেহারা হয়ে পড়েছে। এদিকে জেলা মৎস্য অফিস বলছেন এ ঘটনায় আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। পুকুরের পানি বৃদ্ধি, পানিতে এ্যারোয়েটর চালু ও অক্সিজেন ট্যাবলেট প্রয়োগের পরামর্শ দিয়েছেন জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. মোঃ খালেদ কনক।
বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলায় শনিবার রাতে হঠাৎ বৃষ্টিতে চিংড়ি ঘেরের পানিতে অক্সিজেনের মাত্র কমে যাওয়ায় হাজার হাজার ঘেরের গলদা-বাগদা চিংড়ি মাছ মারা গেছে। স্থানীয় চাষীরা সহায় সম্বল টুকু হারিয়ে এখন নিস্ব হয়ে পড়েছে। বেশিরভাগ চাষী এনজিও ও ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে মাছ চাষ করে জীবন জীবিকা নির্বাহ করতেন। কিন্তু এই ব্যাপক ক্ষতি কাটিয়ে কিভাবে তারা ঋণ পরিশোধ করবে তাই নিয়ে এখন দুশ্চিন্তা। সরকারের কাছে এসব ক্ষতিগ্রস্থ চাষীদের বিদ্যমান ঋণের সুদ মাফ ও বিনাসুদে নতুন করে ঋণ দেওয়ার দাবি জানান স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। রোববার একদিনেই ফলতিতা মৎস্য আড়তে মরে যাওয়া চিংড়ি বিক্রি হয়েছে প্রায় ৩ কোটি টাকার। স্বাভাবিক বাজার থাকলে এ মাছ ১৫ থেকে ২০ কোটি কোটি টাকার উপরে বিক্রি হত বলে দাবি ব্যবসায়ীদের। এছাড়া মাছের রং লাল হয়ে যাওয়ায় অনেকে মাছ ফেলে দিয়েছেন। এতে ওই অঞ্চলের চাষীদের ৩০ কোটি টাকার উপরে ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেছেন চাষী ও ব্যবসায়ীরা। মৎস্য কর্মকর্তারা বলছেন শুধু ফকিরহাট উপজেলা নয় বাগেরহাট সদর, মোল্লাহাট ও খুলনার রুপসা উপজেলার চিংড়ি ঘেরেরও মাছ মারারা গেছে অক্সিজেন কমে।


সোমবার সকালে ফলতিতা গ্রামের পুতুল রানী ও খগেন্দ্র রায় বলেন, ৪ বিঘা জমিতে গলদা চিংড়ির চাষ করে জীবন চালাতাম। হঠাৎ মাছ মারা যাওয়ায় আমার প্রায় ৫ লক্ষ টাকার ক্ষতি হয়েছে। এই টাকার বেশিরভাগই ব্যাংক লোনের টাকা। বৃদ্ধ বয়সে কিভাবে এ টাকা শোধ করব তা জানিনা বলে কান্নায় ভেঙ্গে পরেন এই দম্পতি।
চাষী কিরণ চন্দ্র, সুবাস রায়, অপূর্ব রায় বলেন, সকালে ঘুম থেকে উঠে ঘেরের পাড়ে যেতেই দেখি মরা মাছ ভাসছে। পানিতে নেমে দেখি অধিকাংশ মাছ মরে গেছে। এর মধ্যে অনেক মাছ নষ্ট হয়ে গেছে। আড়তে আমরা এক হাজার ১২‘শ টাকা কেজি মূল্যের মাছ মাত্র ২‘শ থেকে ৩‘শ টাকায় বিক্রি করেছি।
তারা আরও বলেন, জীবনে কখনও এরকম বিপর্যয় দেখিনি। আমাদের প্রত্যেকের ঘেরের প্রায় ৮০ শতাংশ মাছ মরে গেছে। আমরা কিভাবে ঋণের টাকা পরিশোধ করব।
স্থানীয় মূলঘর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিটলার গোলদার বলেন, হঠাৎ করে ঘেরের চিংড়ি মাছ মরে যাওয়ায় চাষীরা সর্বশান্ত হয়ে পড়েছে। বেশিরভাগ চাষী এনজিও ও ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে মাছ চাষ করত। মাছ মারা যাওয়ায় কিভাবে তারা ঋণ পরিশোধ করবে তাই নিয়ে এখন দুশ্চিন্তা। এসব ক্ষতিগ্রস্থ চাষীদের সুদ মাফ ও বিনা সুদে নতুন করে ঋণ দেওয়ার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানাই।


জেলার সব থেকে বড় পাইকারী মাছের বাজার ফলতিতা মৎস্য আড়ৎদার সমিতির সভাপতি সৈয়দ তহিদুল ইসলাম পপলু বলেন, প্রতিদিনের ন্যায় সকালে আড়তে আসি। দেখি চারদিক থেকে শুধু চিংড়ি মাছ নিয়ে আসছে চাষীরা। এদিন রবিবার সারা দিনে ফলতিতা বাজারে প্রায় ৩ কোটি টাকার চিংড়ি মাছ বিক্রি হয়েছে। চাষীদের প্রায় ২৫ থেকে ৩০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
ফকিরহাটের সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা অভিজিত শীল বলেন, ঘেরে পানি কম থাকায় এবং হঠাৎ করে বৃষ্টি হওয়ায় ঘেরের পানির অক্সিজেন কমে গিয়ে ফকিরহাট উপজেলার রেজিষ্ট্রেশনকৃত ৮ হাজার ঘেরের প্রায় ৭০ শতাংশ ঘেরের চিংড়ি মাছ মরে গেছে। এছাড়াও বাগেরহাট সদর, মোল্লাহাট ও খুলনার রুপসা উপজেলার চিংড়ি ঘেরেরও মাছ মারা গেছে অক্সিজেন কমে।
বাগেরহাট জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. মোঃ খালেদ কনক বলেন, বিভিন্ন এলাকায় মাইকিং করে পুকুরে অক্সিজেন বাড়াতে ট্যাবলেট ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। চাষীদের আতঙ্কিত না হয়ে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চিংড়ি চাষ করে এই ক্ষতি পুশিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। এছাড়াও এই অবস্থা মোকাবেলার জন্য উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তাসহ মাঠ পর্যায়ে কর্মরত সকলকে মাঠে থেকে চাষীদের পরামর্শ দেওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে কি পরিমান ক্ষতি হয়েছে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না।