বঙ্গোপসাগরে আবারও মাছ ধরা নিষেধাজ্ঞা, জেলেদের মাঝে ক্ষোভ

মো. শহিদুল ইসলাম ও তানজিম।
ইলিশ প্রজনন মৌসুমে মাছ আহরণে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে সরকার। ৯ অক্টোবর থেকে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞায় সাগরে যেতে পারবে না জেলেরা। এর আগে ২০ মে থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত ৬৫ দিন মাছ আহরণ নিষিদ্ধ থাকার পরে মাত্র আড়াই মাসের ব্যবধানে আবারও ২২ দিনের অবরোধের মুখে ইলিশ পড়ছে আহরণকারী জেলেরা। এ নিষেধাজ্ঞার খবরে জেলার সমুদ্রগামী জেলে ও ব্যবসায়ীদের মাঝে ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। ইলিশের ভরা মৌসুমে এ ধরণের নিষেধাজ্ঞার কারণে জেলেরা যেমন আর্থিক ক্ষতির সম্মুখিন হবে তেমনি সামুদ্রিক মাছের সংকটে পড়বে দেশ এমনটি মন্তব্য করেছেন অনেকে। বঙ্গোপসাগর থেকে ইলিশ আহরণের মৌসুম মাত্র মাছ মাস। এর মধ্যে জেলেদের প্রায় আড়াই মাস অবরোধের মধ্যে বেকার থাকতে হচ্ছে। দীর্ঘদিন বেকার থাকায় ঋণে জড়িয়ে পড়ছেন জেলেরা। এতসব ক্ষতি মেনে নিয়ে বাংলাদেশি জেলেরা মাছ আহরণ বন্ধ রাখলেও বাংলাদেশের জল সীমায় প্রবেশ করে বিদেশী জেলেরা মাছ আহরণ করে নিয়ে যাচ্ছে। যার ফলে বাংলাদেশে সামুদ্রিক মাছের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে ইলিশ ধরা জেলেদের সহযোগিতা করা হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় সামান্য বরে দাবী করে জেলেরা।
সোমবার সকালে বাগেরহাট কেবি বাজারে ট্রলারে মাছ নিয়ে আসা জেলে সাইফুল ইসলাম বলেন, বছরে মাত্র ৫ মাস ইলিশ আহরণ করা যায়। গহীন সাগরে জীবনের ঝুকি নিয়ে আমরা মাছ আহরণ করি। এই সময়ের মধ্যেই সরকারের একাধিক নিষেধাজ্ঞা থাকে। তার মধ্যে আমাদের অসুস্থ্যতাসহ নানা সমস্যা থাকে। মাত্র ৫ মাসের মৌসুমে এত বেশি সময় নিষেধাজ্ঞা থাকলে আমরা কিভাবে মাহজনের ঋণ শোধ করব। আর কিভাবে নিজেরা খাব।
ট্রলার মালিক মানিক হোসেন বলেন, প্রতিবার সাগরে একটি ট্রলার পাঠাতে দেড় থেকে দুই লক্ষ টাকা খরচ হয়। কিন্তু এবছর যে মাছ পাচ্ছি, তাতে খরচের টাকা ও উঠছে না। আমরা এ বছরের মত এত ক্ষতির সম্মুখিন কখনও হইনি।
জেলে রুস্তম আলী বলেন, ৬৫ দিনে অবরোধটা একটু কমিয়ে এবং অবরোধের সময় এগিয়ে নিয়ে আসলে জেলেরা আরও বেশি ইলিশ আহরণ করতে পারবে। এই ২২ দিনের অবরোধটা আরও এক সপ্তাহ পড়ে শুরু করে অবরোধের সময় একটু কমানোর দাবি জানাই।


আসলাম নামের আরেক জেলে বলেন, ২২ দিন অবরোধের সময় সরকার মাত্র ২০ কেজি চাল দেয়। আমার তো ৬ জনের সংসার, এই বিশ কেজি চালে কি হয়! আমরা সরকারের কাছে এ সহযোগিতার পরিমান বৃদ্ধির দাবি জানাই।
কয়েকজন জেলে বলেন, ৬৫ এবং ২২ দিন। দুই বারের অবরোধে আমাদের প্রায় ত্রিশ দিন বেকার থাকতে হয়। এর সাথে ঝড়, জলচ্ছাস, বন্যাসহ বিভিন্ন সমস্যায় আমাদেরকে মাছ আহরণ বন্ধ রাখতে হয়। এই সময়ে আমাদের কোন আয় থাকে না। অবরোধের সময় সরকারের পক্ষ থেকে সামান্য সযোগিতা কেউ কেউ পেলেও, বেশিরভাগ জেলেরা এ সহযোগিতার বাইরে থাকে। যে সময়টা মাছ ধরা বন্ধ থাকে সে সময় সরকার যদি আমাদের জন্য বিকল্প কোন কর্মসংস্থান ও কিছু সহযোগিতার ব্যবস্থা করেন তাহলে আমরা খেয়ে পড়ে ভাল থাকতে পারি।
বাগেরহাট মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র কেবি বাজার মাছ ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অনুপ কুমার বলেন, বর্তমান মাছের যে অবস্থা তাতে এ ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়া ছাড়া কোন উপায় নেই। এবছর সবচেয়ে বড় লোকসানের মুখে পড়েছি। ৩০ বছর ধরে ব্যবসা করি ইলিশ মাছের এমন বিপর্যয় ব্যবসায়িক জীবনে দেখিনি।
বাগেরহাট জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. মোঃ খালেদ কনক বলেন, ইলিশের প্রজনন মৌসুমে অবরোধের ফলে দেশের মোট ইলিশ উৎপাদন যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমনি ইলিশের গড় আকারও বড় হয়েছে। তবে অবরোধের সময় জেলায় ৩৯ হাজার ৫‘শ জেলে রয়েছে। এর মধ্যে বাগেরহাট সদর, কচুয়া, মোংলা, মোরেলগঞ্জ, রামপাল, মোংলা, শরণখোলায় ইলিশ জেলে রয়েছে। ২২দিন অবরোধের সময় এই সাত উপজেলার ৫ হাজার ১‘শ ৯৪ জন ইলিশ জেলেকে সহযোগিতা করব। এই সময়ে প্রত্যেক জেলে ২০ কেজি করে চাল প্রদান করা হবে।#