শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে শিক্ষাকে জাতীয়করন করতে হবে

১৪৩ বছর পূর্বে প্রতিষ্ঠিত বাগেরহাট জেলার প্রাচিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বাগেরহাট বহুমুখী কলেজিয়েট স্কুল। প্রতিষ্ঠানটির প্রথম নারী অধ্যক্ষ মোসাঃ ফারহানা আক্তার তার প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন সুবিধা,অসুবিধা, বর্তমান শিক্ষাব্যবস্তা ও তার জীবনের নানা চ্যলেঞ্জ এর কথা বলেছেন । তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আলোর পথে-এর  প্রতিবেদক মোঃ শহিদুল ইসলাম।

আলোরপথে: শুভেচ্ছা কেমন আছেন?
ফারহানা আক্তার: আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। শুভ কামনা আপনাদের প্রতি।
আলোরপথে: আপনার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নাম কি?
ফারহানা আক্তার: বাগেরহাট বহুমুখী কলেজিয়েট স্কুল বাগেরহাট।
আলোরপথে: কেমন চলছে আপনার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
ফারহানা আক্তার: প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে প্রতিষ্ঠানটি ছিল শহরের মধ্যে শীর্ষ অবস্থানে। এটিই তৎকালীন ১৮৭৮ সালে অর্থাৎ ১৪৩ বছর পূর্বে বাগেরহাট জেলার প্রাচীনতম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। শহরের সকল উচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে সকল শ্রেণি পেশার মানুষ এই প্রতিষ্ঠানে তাদের সন্তানদের ভর্তির জন্য উন্মুখ হয়ে থাকতেন। প্রতিষ্ঠানটি তার সূদীর্ঘকালের ধারাবাহিকতা আজও বজায় রেখেছে, তখন এই এলাকাতে অন্য কোন প্রতিষ্ঠান না থাকায় তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক গৌর চন্দ্র বসাক এই প্রতিষ্ঠানটি চালু করেন। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির সভাপতি বাগেরহাট পৌরসভার মেয়র খান হাবিবুর রহমান, তার সুদক্ষ নির্দেশনা ও প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠানটি তার শতবর্ষীয় গৌরব ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। বর্তমানে এ প্রতিষ্ঠানে এক হাজার দুইশত শিক্ষার্থী অধ্যায়ন করছে। এখানে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, কলেজ মোট ৩ পর্যায়ে শিক্ষাদান করা হয়। অত্যান্ত সুনামের সাথে প্রতিষ্ঠানটিতে আমরা পাঠদান করছি।
আলোরপথে: জেলায় এই প্রতিষ্ঠানের অবস্থান কেমন?
ফারহানা আক্তার: জেলায় এই প্রতিষ্ঠানের অবস্থান বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১ম বলে আমি দাবি করি। কারন এই প্রতিষ্ঠানের লেখাপড়ার মান এর পাশাপাশি খেলাধুলায় বহুবার জাতীয় পুরস্কার পেয়েছে, বিতর্ক প্রতিযোগিতায় জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্তী সহ এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক শ্রেষ্ট শিক্ষকের মর্জাদা অর্জন করেছে। সুতরাং বাগেরহাট জেলায় এই প্রতিষ্ঠানটি সগৌরবে মাথা উচু করে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত করে।
আলোরপথে: আপনার প্রতিষ্ঠানের ফলাফল কেমন?
ফারহানা আক্তার: আমার প্রতিষ্ঠানের ফলাফল সন্তোষজনক। তবে আরও ভালো ফলাফলের জন্য আমার শিক্ষকরা নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন, গত বছর ২০১৯ এস,এস,সি রেজাল্ট পসের হার ৯২.১৭ % এবং অন্য সকল পরিক্ষায় আমাদের ফলাফল ভালো।
আলোরপথে: এলাকার শিক্ষার হার সম্পর্কে কিছু বলবেন কি?
ফারহানা আক্তার: বাগেরহাট জেলা একটি ঐতিতহ্যমন্ডিত জেলা । এখানে বিশ্ব ঐতিহ্য ষাট গম্বুজ মসজিদ , খান-ই-জাহান (রঃ) এর মাজার, মোংলা বন্দরসহ সুন্দরবন বেষ্টিত একটি শহর, এই শহরের লোকজন সচেতন বলে এখানকার অধিকাংশ লোকই শিক্ষিত। এখানকার শিক্ষার হার সন্তোষজনক।
আলোরপথে: আপনার ছাত্রকালীন শিক্ষা আর বর্তমান শিক্ষার মধ্যে কতটুকু তফাত দেখছেন।
ফারহানা আক্তার: আমার ছাত্রকালীন সময় আর বর্তমান শিক্ষার মধ্যে বেষ কিছু পর্থক্য রয়েছে। আমি বর্তমানে যে প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করছি মূলত এটিই আমার শিক্ষাকেন্দ্র। অর্থাৎ আমি এই প্রতিষ্ঠানেই লেখাপড়া করেছি। সেকারনে আমার খুবই ভালো লাগে। নিজ প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করা এটি আলাদা ভালো লাগার বিষয়। আমাদের সময় মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম , কম্পিউটার ল্যাব ছিলনা যা বর্তমানে আছে সর্বোপরি বর্তমান সরকারের উদ্ভাবনী পরিকল্পনার মাধ্যমে যে শিক্ষাব্যবস্থা এগিয়ে চলছে তাতে আমি বলতে পারি বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা অত্যান্ত ফলপ্রসূ, কার্যকরী এবং টেকসই।
আলোরপথে: এখন তো প্রযুক্তিগত শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে, এই শিক্ষা ব্যবস্থাকে এগিয়ে নিতে শিক্ষকদের ভূমিকা সম্পর্কে বলুন?
ফারহানা আক্তার: বর্তমানে প্রযুক্তিগত যে শিক্ষাব্যবস্থা এটাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে সবচেয়ে বড় ভ’মিকা পালন করতে হবে শিক্ষকেেদর । বর্তমান সরকার সেভাবেই শিক্ষকদের প্রশিক্ষনের ব্যাবস্থা করছেন । আমি নিজেও দেশে ও বিদেশে অসংখ্য প্রশিক্ষনে অংশ নিয়েছি। ভারত ও থাইল্যান্ডে প্রশিক্ষনের সময় আমি দেখেছি প্রযুক্তিগত শিক্ষার ব্যাবহার ও তার কার্যকারিতা সুতরাং আমি একজন শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠান প্রধান হিসেবে বলতে চাই ভিশন ২০২১- ভিশন ২০৪১ বাস্তবায়নের জন্য শিক্ষকদের আরো বেশি গতিশীল ও দক্ষ হতে হবে।
আলোরপথে: শিক্ষার্থর বিকাশে শিক্ষা পরিবেশ কেমন হওয়া উচিত?
ফারহানা আক্তার: শিক্ষার্থীর শারিরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন, একজন শিক্ষার্থী সকালে ১০টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত ৬ ঘন্টা কোন কোন ক্ষেত্রে বিশেষ ক্লাসসহ ৮ ঘন্টা স্কুলে অবস্থান করে । এই সময়ে তার বসার জন্য বরাদ্দ থাকে দেড়ফুট জায়গা। এটি একজন শিক্ষার্থীর জন্য শারিরীক ও মানসিক বিকাশে বাধাগ্রস্ত করে। এছাড়া স্যানিট্যাশন ব্যবস্থা শিক্ষার্থীর অনুকুলে থাকা উচিত। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় শিক্ষার্থীরা সঠিকভাবে বাথরুমে যেতে পারেনা। ফলে দিনে দিনে মারাত্মক সাস্থ ঝুকিতে পড়ে যায়। মেয়েদের বয়সন্ধিকালের যেসকল অসুবিধা যেমন বাথরুম সংক্রান্ত অসুবিধায় তারা সঠিক সময়ে পরিস্কার হতে পারেনা এসকল কারনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অবকাঠামোগত সুবিধা, পর্যাপ্ত বসার যায়গা, খেলার পরিবেশ, বাথরুম সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য সরকারের প্রতি ও দায়িত্বশীলদের প্রতি অনুরোধ জানাচ্ছি।
আলোরপথে: শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে কি কি করা উচিত বলে আপনি মনে করেন?
ফারহানা আক্তার: শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে প্রথমেই শিক্ষাকে জাতীয়করন করতে হবে। একই দেশে ভিন্ন ভিন্ন আংগিকে শিক্ষাদানের কারনে শিক্ষাব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষাকে একটি ফরম্যাটে নিয়ে আসতে হবে। তাহলেই শিক্ষার মানোন্নয়ন সম্ভব হবে বলে আমি মনে করি।
আলোরপথে: আপনার প্রতিষ্ঠানটি কি এমপিওভূক্ত?
ফারহানা আক্তার: হ্যা আমার প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভূক্ত এবং স্থয়ী স্বীকৃতীপ্রাপ্ত, কলেজ শাখা এমপিওভ’ক্তির প্রচেষ্টা চলছে।
আলোরপথে: আগে পত্রিকায় দেখা যেত শিক্ষকদের দারিদ্রপূর্ণ ছবি, এখন তো সে ব্যবস্থার অবসান হয়েছে। এ সম্পর্কে আপনার বক্তব্য কি?
ফারহানা আক্তার: পূর্বে শিক্ষকরা অসহায় অবস্থাতে থাকলেও বর্তমান সরকারের প্রচেষ্টায় শিক্ষকরা ভালো অবস্থায় আছে ।
আলোরপথে: নারী হিসেবে কতটা সহজ ভাবে প্রতিষ্ঠান প্রধানের দায়িত্ব পালন করতে পারছেন?
ফারহানা আক্তার: একজন নারী প্রতিষ্ঠান প্রধান হিসেবে আমি অত্যান্ত সাহসিকতার সাথে ও আন্তরিকতায় আমার দায়িত্ব পালন করছি। আমার শিক্ষকতার বয়স ১৪ বছর । আমি কখনো কোনো কাজে নিজেকে নারী হিসাবে গুটিয়ে রাখিনি। আমি নিজেকে একজন মানুষ মনে করে সব সময় কাজ করেছি। আর সে কারনে আমি ২০১৬ ও ২০১৭ পরপর দুইবার বাগেরহাট সদরের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছি। শুধু তাই নয় আমি বংলাদেশের সর্বোচ্চ শিক্ষক প্রশিক্ষন ইনস্টিটিউট ন্যাশনাল শিক্ষা ব্যাবস্থাপনা একাডেমির বাছাইকৃত ৩৬ জন প্রতিষ্ঠান প্রধানের মধ্যে তিনটি ক্যাটাগরির পরিক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেছি। ভালো ফলাফল করার কারনে বিভিন্ন দেশে ট্রেনিং করার সুযোগ পেয়েছি, বিভিন্ন সনদপত্র ও পদক অর্জন করতে পেরেছি। সুতরাং নারী হিসেবে আমি কখনোই নিজেকে আলাদা কিছু মনে করিনা। আমি সরল সাহসিকতা, দক্ষতা ও সততার সাথে আমার দায়িত্ব পালন করছি।
আলোরপথে: ছাত্র শিক্ষক সম্পর্ক আরও নির্ভর করতে আপনার পরামর্শ কি?
ফারহানা আক্তার: এ বিষয়ে শিক্ষকদের দক্ষ হতে হবে। শিক্ষককে শিক্ষার্থীর অণুপ্রেরনার উৎস হতে হবে। একজন শিক্ষার্থী মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার শিক্ষকের মতামত গ্রহন করবে সে কৌশল শিক্ষককে অর্জন করতে হবে।
জবাবদিহি: আপনাদের অনেক সময় দাবি আদায়ে রাজপথে নামতে হয়। কেমন হলে আপনাদের আর রাজপথে নামতে হবে না।
আলোরপথে: শিক্ষার উন্নয়নে অভিভাবকদের সম্পর্কে কিছু বলেন?
ফারহানা আক্তার: এবিষয় অভিভাবকদের আমি বলতে চাই পারিবারিক শান্তি বজায় রাখুন, কারন উচ্চবিত্ত থেকে মদ্ধবিত্ত সকল শ্রেনির মধ্যে পারিবারিক কলহ একটি নৈমিত্তিক বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে। যার প্রভাব পড়ছে সন্তানের ওপর। তাই প্রতিটি পিতা মাতার সন্তানের জন্য নিজেদের সহনশীল হওয়ার পরামর্শ রইলো। এছড়া সন্তানের ওপর খেয়াল রাখতে হবে যাতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত মোবাইল ফোন ব্যবহার না করে। ইন্টারনেট ব্যাবহরে সন্তানকে সচেতন করা এবং সন্তানের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে তার লেখাপড়ার খেয়ল রাখতে হবে। নিয়মিত সন্তানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ রাখতে হবে।
আলোরপথে: ধন্যবাদ, ভালো থাকবেন।
ফারহানা আক্তার: আপনাদেরও ধন্যবাদ, আলোরপথে অনলাইনের সম্পাদকসহ সকল কুশলীদের আমার ও প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ এবং শুভ কামনা।