খেয়ে না খেয়ে জীবন যুদ্বে পার করছেন শেফালী

নিজস্ব প্রতিবেদক. ‘খাই বা না খাই পেট তো চলবেই। দুই দিন যায়, তিনদিন যায়, হয় না! পেটের ভাত জোটে না। গরিবের খিদে নেই। খাওয়া নেই। গরিব খেতে জানেনা। অভাব! এলাকার মানুষের খুব অভাব। মানুষ যে সাহায্য করবে সেরম অবস্থা নেই। আসলে গরিবের কষ্টের শেষ নেই। এভাবে থাকতে হবে।আমাদের আর কি করার আছে। এভাবে থাকতে হবে’।
কথাগুলো বলছিলেন বাগেরহাট সদর উপজেলার চিতলী-বৈটপুর গ্রামের বাসিন্দা চল্লিশ বছর বয়সী শেফালী বেগম।২৪ বছরের উপরে শেফালী বেগম এই এলাকায় বসবাস করলেও থাকেন ভাড়া বাড়িতে।দু-মুঠো ভাত খেয়ে জীবনে বেঁচে থাকার জন্য মাটি কাটা, সড়ক সংস্কার, ভ্যান চালানো, ঠেলা গাড়ি ঠেলা, চাল ও কাঠের মিলে কাজসহ নানা প্রকার কাজ করেছেন তিনি।স্থানীয় বাবুর্চীদের সাথে মানুষের বাড়িতে রান্নাও করেছেন।বিয়ের কিছুদিন পরে মাত্র ১৬-১৭ বছর বয়সে একমাত্র সন্তানকে পেটে নিয়ে ২৪ বছর আগে খুলণার পাইকগাছা উপজেলার স্বামী রহমত মোল্লার অত্যাচারে সংসার ছেড়ে চলে আসেন। কাজ নেন খুলনা শহরের একটি অটো রাইস মিলে।পরিচিত লোকজন চাপ দিতে থাকে পেটের সন্তানকে ফেলে (এ্যাবর্শন) দেওয়ার জন্য। সন্তানের মায়ায় পালিয়ে চলে আসেন বাগেরহাটে।খোজ নেয়নি কেউ। কে-ই বা খোজ নিবে, বাবা নওয়াব আলী শেখ ও মা নুরজাহান বেগম মারা গেছেন অনেক আগেই। একমাত্র বোন পারভীনেরও খোজ নেওয়ার সুযোগ নেই শেফালীর। কারণ পারভীন নিজেই অন্ধ। অন্যের উপর নির্ভর করে বেঁচে আছে সেও।
বাগেরহাটে আসার পরে পেটে সন্তান থাকায় তেমন কোন কাজ না করতে পারতেন না শেফালী। ভিক্ষা করেই জীবন বাচিয়েছেন তিনি। পরবর্তীতে সন্তান শাকিলের জন্মের বছর দুয়েক পরে ভিক্ষা বন্ধ করে বিভিন্ন ধরণের কাজ শুরু করেন। এভাবে কাজ করে ছেলেকে বড় করেছেন। বছর চারেক আগে ছেলে বিয়ে করে বউ নিয়ে আলাদা থাকে।করোনা পরিস্থিতি শুরু হওয়ার আগে মাকে সামান্য সহযোগিতা করলেও, করোনা শুরু হওয়ার পরে মায়ের খোজ নেওয়ার সুযোগ নেই তার। কারণ নিজের সংসারই চলে না। এদিকে করোনার ফলে বাসাবাড়িসহ অন্য কাজ বন্ধ হওয়ায় মারাত্মক বিপাকে পরে শেফালি।খেয়ে না খেয়ে দিন যায়তার।৫‘শ টাকা বাড়ি ভাড়া, তাও বাকি ৪ মাস। পেটের তাগিদে রাস্তার পাশ ও বিভিন্ন ডোবা থেকে শাক তুলে বিক্রি করা শুরু করেন বাজারে। শাক বিক্রি করে যে আয় হয়, তাতে দুই বেলার খাবারও হয় না।
বাগেরহাট শহরতলীর মেরিন ইনস্টিটিউটের সামনের ডোবায় বুক সমান পানিতে নেমে শাক তোলার সময় কথা হয় শেফালির সাথে। শেফালি বলেন, ছোট বেলায় মা-বাবা মারা যায়। খুলনার এক বড় বাড়িতে কাজের মেয়ে হিসেবে খেয়ে পড়ে বড় হয়েছি। তারা বিয়ে দিয়েছিল। কপাল খারাপ স্বামী প্রচুর মারধর করত। যে বাড়িতে থেকেছি তাদের কাছ থেকে টাকা আনতে বলত। স্বামীর অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে সন্তান পেটে নিয়ে চলে আসছি। সন্তানকে নিয়ে বেঁচে থাকার জন্য ভ্যান চালানো থেকে শুরু করে এমন কোন কাজ নেই যা আমি করিনি। নিজে একটি ভ্যানও কিনেছিলাম। ভ্যান চালিয়ে ভালই চলছি মা-ছেলের সংসার। কিন্তু এক্সিডেন্ট করার পরে আর চালাইনি। কিছুদিন অন্যের বাড়িতে রান্নাও করেছি।কিন্তু পা ভেঙ্গে যাওয়ার পরে আর তা করতে পারি না। করোনা আসার পরে অন্যসব কাজ বন্ধ হয়ে যায়।খেয়ে না খেয়ে দিন যায় আমার। এই শাক তুলতেছি। হাটে এবং বিভিন্ন মোড়ে নিয়ে যাব। যা হয় তাই খেয়ে বাঁচতে হবে।আসলে গরিবের কষ্টের কোন শেষে নেই। কত যায়গা দরখাস্ত দিয়েছি, কত জনের কাছে গেছি। কিছুই পাইনি।আসলে লোক থাকতে হয়।গার্জিয়ান না থাকলে কি কিছু পাওয়া যায়।
শেফালী আরও বলেন, জন্মের পর থেকে শান্তিতে থাকতে পারিনি। আর যতদিন বাঁচব, কি খাব কিভাবে জীবন পার করব জানিনা।৪ মাস ভাড়া দিতে পারি না। লজ্জায় মালিকের সামনে যাই না।শুনেছি সরকার অনেক কিছু দেয়। আমাকে যদি একটু থাকার জায়গা দিত। তাইলে মাস গেলে ভাড়া দেওয়ার চিন্তা থাকত না। মানুষের ঘর-বাড়ি পরিস্কার করে হলেও খেয়ে বাঁচতে পারতাম।


শেফালীর প্রতিবেশী জাকির ডাকুয়া বলেন, প্রায় ২৩-২৪ বছর শেফালী আমাদের এলাকায় থাকে। ভ্যান চালানো, ট্যালা গাড়ি ঠেলা, রাস্তায় কাজসহ পুরুষের সাথে সমান তালে কাজ করেছে সে। কিন্তু এখন শরীর নিয়ে আর পারে না। শাক বিক্রিই ওর একমাত্র ভরসা। আর আমাদের কাছে মাঝে মাঝে আসে। যখন যা পারি তা দিয়ে সহযোগিতা করি।
শেফালীর বাড়ির মালিক আরিফুল ইসলাম নিজাম বলেন, ৩ বছরের বেশি হল শেফালী আমার বাড়িতে ভাড়া থাকে। অন্য ভাড়াটিয়াদের কাছ থেকে ৬‘শ টাকা নিলেও শেফালীর কাছ থেকে নেই ৫‘শ টাকা। শুধু ভাতের জন্য যে কষ্ট করে তা বর্ণনাতীত। শেফালীকে সহযোগিতার জন্য বিকাশ করুণ ০১৭৯৪-০৬৪০২০ নাম্বারে। শেফালীর সাথে কথা বলতে পারেন ০১৮৫৭-১৩৮৯৭৬ নাম্বারে।
বাগেরহাট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ মুছাব্বেরুল ইসলাম বলেণ, শেফালীর বিষয়টি আপনার মাধ্যমেই আমি জানলাম। শেফালীর নিজের ঘরবাড়ি নেই, তিনি ভাড়া থাকেন।সরকারি বিভিন্ন পুনর্বাসন কর্মসূচি আছে, যেখানে তাকে স্থায়ী পুনর্বাসনের সুযোগ রয়েছে। আমরা প্রথমে তার প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করে, যাচাই বাচাই করব।তার জন্য সুবিধাজনক যেকোন একটি পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় তাকে আমরা নিয়ে আসব। এছাড়া তাৎক্ষনিকভাবে তাকে যেসব সহযোগিতা দেওয়া যায় সেগুলো দেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।