শুটকী আহরণে সুন্দরবনে কয়েক হাজার জেলেদের সমুদ্রে যাত্রা

মো. শহিদুল ইসলাম. সব ধরণের প্রস্তুতি শেষে সুন্দরবনেও শুটকী আহরণে কয়েক হাজার জেলেদের সমুদ্রে যাত্রা শুরু হবে বৃহস্পতিবার ভোর থেকেই। জেলেরা ট্রলারে জালসহ প্রয়োজনীয় সড়ঞ্জামাদি নিয়ে সুন্দরবনের উদ্দেশ্যে রওনা দিবে। প্রতিবছরই জীবনের ঝুকি নিয়ে বাগেরহাটের দুই সহস্রাধিক জেলে ৫ মাস অবস্থান করেন সুন্দরবনে। এছাড়া চট্টগ্রাম, বরগুনা, পিরোজপুর, সাতক্ষিরাসহ কয়েকটি জেলা থেকে আরও হাজার দশেক জেলে শুটকী মৌসুমে সুন্দরবনে যায়।মাত্র পাঁচ মাসে বঙ্গোপসাগর থেকে আহোরিত মাছে বিপুল পরিমান শুটকী তৈরি হয় সুন্দরবনের দুবলার চরসহ কয়েকটি চরে।এতে ব্যবসায়ীদের আয়ের পাশাপাশি সরকারও যেমন মোটা অংকের  রাজস্ব পায়।তবে দীর্ঘদিন ধরে সুন্দরবনে শুটকী আহরণ করলেও আর্থিক উন্নতি হয়না জেলেদের।তারপরও বাপ দাদার পেশাকে বাচিয়ে রাখা ও ভাল কিছু না হওয়ায় প্রতিবছরই অনিশ্চিত যাত্রা করছেন জেলেরা।

জেলেরা জানান, প্রতিবছর শীত আসার আগে থেকে সুন্দরবনে শুটকী উৎপাদন মৌসুম শুরু হয়।আমরা ঝড় জলচ্ছাস, অসুস্থ্যতা, বাঘ-কুমিরসহ ভয়ঙ্কর জন্তু জানোয়ার ও মাছের ভয় উপেক্ষা করে আমরা পাঁচ মাস অবস্থান করি সুন্দরবনে। এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না। বৃহস্পতিবার ভোর থেকে আমরা যাত্র শুরু করব সুন্দরবনের উদ্দেশ্যে। পরিবার-পরিজন ছাড়া খেয়ে না খেয়ে মাছ ধরি, শুটকী উৎপাদন করি।কিন্তু পাঁচ মাসে যে টাকা পাই তা দিয়ে সংসার চলে না। কষ্টে থাকি সারা বছর।

শরণখোলা উপজেলার জেলে আনোয়ার হোসেন, নুরুল আমিন, দুলাল, মুকুলসহ কয়েকজন বলেন, প্রতি বছর আমরা বিভিন্নভাবে ঋন করে সমুদ্রে যাই। সরকারী ভাবে আমরা কোন সাহায্য সহযোগীতা পাই না। সুন্দরবনের বনদস্যু-জলদস্যুর উৎপাত ও মুক্তিপন আদায় এবং অসাধু বনরক্ষীদের দৌরাত্ব কিছুটা বন্ধ হলেও এখনও সীমাহীন সমস্যায় জর্জরিত আমরা। শুটকী জেলেদের আলাদা তালিকা করে সরকারি সহযোগিতা দেওয়া দাবি জানান তারা।

শুটকী ব্যবসায়ী সৈয়দ শুকুর আলী বলেন, প্রতি বছর ৬ টি জাল, ৩ টি ট্রলার ও ২৮ জন কর্মচারী নিয়ে চলতি শুটকী মৌসুমে সুন্দরবনে যাই।এ মৌসুমে সাবাড় (বহার) নিয়ে সমুদ্রে যেতে ২০ লক্ষ টাকার প্রয়োজন। এ জন্য ব্রাক এনজিও থেকে ১০ লক্ষ টাকা, আশা এনজিও থেকে ৪ লক্ষ টাকা ও বাকী টাকা ৬ লক্ষ টাকা এলাকার সুদে মহাজনদের কাছ থেকে মাত্র সাড়ে ৫ মাস মেয়াদে চড়াসুদে ঋন নিয়েছে।৫ মাসে এত টাকা উঠাতে পারব কিনা তাও সন্দেহ রয়েছে।  সরকারি রাজস্ব, ট্রলার মেরামত, তেল খরচ, জেলেদের ভরন পোষন ও বেতন সব মিলিয়ে আমাদের ব্যবসা একটা অনিশ্চিত জুয়ার মত। ভাল মাছ ধরা পড়লে লাভ অনেক হবে।কিন্তু যদি মাছ কম পাই তাইলে অনেক বিপদে পড়তে হয় আমাদের।

রামপাল সদরের ফরহাদ শেখ, শ্রীফলতলার  শাহাজান শিকদার, সিকিরডাঙ্গার জুলফিক্কার গাজী, শ্রীফলতলার মোঃ জয়নাল শেখ, আনছার শিকদার, আক্কাছ আলী শেখ, ইউছুব আলী শেখ বলেন, সুন্দরবনে শুটকী আহরণের সময় পরিবার পরিজনের ভরন পোষনের জন্য চরাসুদে টাকা আনতে হয়।৫মাস পরে এলাকায় এসে সুদে আনা টাকার প্রায় ২ থেকে ৪ গুন পরিষোধ করতে হয়।সুন্দরবনে আমরা নিয়মিত। আর আমরা যারা যাই তারা প্রতিবছরই যাই। সুন্দরবনে যাওয়ার আগে সরকার স্বল্প সময়ের জন্য আমাদের সামান্য কিছু টাকা বিনা সুদে সহযোগিতা করত তাহলে আমাদের খুব উপকার হত।

সেভ দ্য সুন্দরবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও সুন্দরবন বিশেষজ্ঞ ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, সুন্দরবন আমাদের প্রাকৃতিক রক্ষা কবজ। ঝড়-জলোচ্ছাস থেকে দীর্ঘ্যদিন ধরে আমাদের মায়ের মত আগলে রেখেছে। মনুষ্য সৃষ্টি বিভিন্ন কারণে মারত্মক বিপর্যায়ের মুখে পড়েছে ইউনেস্কো ঘোষিত ওয়ার্ল্ড হ্যারিটেজ সুন্দরবন। জেলেরা যাতে বাস্ততন্ত্র রক্ষা করে শুটকীর জন্য মৎস্য আহরণ করতে পারে সেজন্য বন বিভাগের ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করে গড়ে তোলার পাশাপাশি জেলেদের আর্থিক সহযোগিতা দেওয়ারও দাবি জানান তিনি।

সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো: বেলায়েত হোসেন বলেন, শীতে করোনার প্রকোপ বাড়বে। তাই জেলেদের বাধ্যতা মূলক মাস্ক পরিধান, হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহারের শর্ত দিয়ে সাগরে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছি। এছাড়া প্রত্যেক ট্রলারে প্রাথমিক চিকিৎসা বক্স রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।করোনা বিধি নিষেধের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখার জন্য দুবলা ফিসারম্যান গ্রুপের নেতৃবৃন্দদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

২০১৮-১৯ অর্থবছরে ২ কোটি ৪৬ লক্ষ ৬৭ হাজার ৮১৯ টাকা এবং ২০১৯-২০ সালে অর্থবছরে ২ কোটি ৭৩ লক্ষ ৯৮ হাজার ০৪৮ টাকা রাজস্ব আদায় করা হয়েছে। ২০২০-২১ অর্থ বছরে ৩ কোটি ২০ লাখ টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করেছে বন বিভাগ।