সিডর. ১৩ বছর পরেও স্বজন হারানো ভায়বহ স্মৃতিতে আতকে উঠেন বাগেরহাটবাসী

এসএস শোহান. বলেশ্বর নদীর তীরে বাড়ি। ছোট বেলা থেকে ঝড়-জলচ্ছাসের সাথেই বড় হয়েছি।সিডরের দিন (২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর) সন্ধ্যা থেকেই একটু বৃষ্টি ও সামান্য বাতাস হচ্ছিল। ভাবছিলাম এটাতো সব সময়ই হয়।আব্বার সাথে পরামর্শ করে সবাই মিলে ঘরেই থাকলাম। আনুমানিক রাত ১১টার দিকে হঠাৎ বাতাসের বেগ বাড়ল।সবাইকে বললাম দ্রুত ঘর থেকে বের হও।আমিও মুহুর্তের মধ্যে ঘর থেকে বের হয়ে পুরোতন বেড়িবাঁধের মধ্যে থাকা নুর মোহাম্মাদের বাড়িতে গিয়ে উঠি। মাত্র ৫ মিনিটের ব্যবধানে কয়েকফুট উচ্চতার পানির স্রোতে আসে।নুর মোহাম্মাদের ঘরের সকল দরজা খোলা ছিল। তার ঘরের মধ্যে যখন চার ফুট পানি প্রবেশ করে তখন সাতরে বের হয়ে যাই। পানির স্রোতে যেতে খুব কষ্টা হচ্ছিল তারপরও অনেক কষ্টে পাশের বাড়ির আব্দুল মল্লিকের বাড়ির একটি গাছে উঠে জীবন রক্ষা করেছিলাম। এসব হয়েছিল খুব অল্প সময়ে। ফজরের আজানের পরে আমি গাছ থেকে নেমে বাড়িতে এসে দেখি আমাদের ঘরের কোন চিহ্ন নেই। ঘরে থাকা বাবা (মোঃ লাল মিয়া হাওলাদার), মা (তাসলিশা বেগম), ছোট দুই ভাই (তহিদ ও জাহিদ) ও এক বোন (লাবনি)কে আর খুজে পেলাম না। পরবর্তীতে বিভিন্ন জায়গা খোজাখুজির পর ধান ক্ষেতের মধ্যে বাবা, মা ও এক ভাইয়ের মরদেহ পাই। আর কোন দিনই এক ভাই ও এক বোনের মরদেহ খুঝে পাইনি।

কথাগুলো বলছিলেন, ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর সিডরে বাবা-মাসহ পরিবারের পাঁচ সদস্যকে হারানো শরণখোলা উপজেলার উত্তর সাউথখালী গ্রামের লাল মিয়া হাওলাদারের ছেলে মোঃ বাদল হাওলাদার।সিডরের ক্ষত কাটিয়ে উঠলেও দুঃসহ স্মৃতি কাঁদায় বাদলকে। আতকে উঠেন স্বজন হারানোর বেদনায়।বাদলের দাবি সাউথখালী ইউনিয়নকে রক্ষার জন্য নদী শাসন করে বেড়িবাঁধ নির্মান করতে হবে। তা না হলে আবারও আমাদের হারাতে হবে বাপ-দাদার পৈত্রিক ভিটা ও প্রাণের সন্তানদের।

সিডরে পরিবারের সাত সদস্য হারানো শরণখোলা উপজেলার উত্তর সাউথখালী গ্রামের মৃত আব্দুর রহমানের ছেলে আল আমিন খান বলেন, সন্ধ্যার দিকে মা এক ধরণের জোর করে তাফাল বাড়ি বাজারে পাঠান কিছু জিনিসপত্র কিনতে। কিন্তু তাফালবাড়ি বাজারে যাওয়ার পরে বৃষ্টি বাড়লে আমি আর বাড়ি আসিনি। যখন বাতাস বৃদ্ধি পেয়েছে আমি তাফালবাড়ি বাজার সংলগ্ন একটি ভবনে ছিলাম। রাত আনুমানিক তিনটার দিকে বাতাস কমে গেলে রাস্তায় বের হয়ে দেখি গাছ আর গাছ। হাটার কোন উপায় নেই। অনেক কষ্ট করে বাড়িতে গিয়ে আমাদের ঘরের কোন চিহ্ন পেলাম না। বাড়িতে থাকা বাবা (আব্দুর রহমান), মা (সুপিয়া বেগম), ফুফু (হায়াতুননেছা) ফুফাতো বোন (হনুফা ও ফাতেমা), ভাগ্নে (আবু হানিফ) এবং নানী (নুর বানু)কে আর খুজে পাই না।পরের দিন ধান ক্ষেত, মানুষের বাগানসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে মরদেহ এনে কবর দিয়েছিলাম। সব হারিয়ে আসা ছিল বেড়িবাঁধ হলে বাবার যেটুকু জমি-জমা আছে তাই নিয়ে খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকব। কিন্তু সিডরের পরেও প্রতিবছর বৃষ্টির মৌসুমে এলাকার অনেকেই জমি হারিয়েছে বলেশ্বর নদীতে।আমরা ত্রাণ চাইনা, আমাদের এলাকার মানুষের জানমাল রক্ষার জন্য টেকসই বেড়িবাঁধ চাই।

আল আমিন আরও বলেন, সিডরের সময় আমার বয়স ছিল মাত্র ১৭ বছর। তখন থেকেই প্রতিবছর এই দিনে মিলাদ মাহফিলের আায়োজন করি। আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই, দয়া ভিক্ষা চাই যাতে সিডরের মোত কোন বড় দূর্যোগে এভাবে আমাদের স্বজনদের হারাতে না হয়।

শুধু আল আমিন এবং বাদল হাওলাদার নয় এমন স্মৃতি রয়েছে শরণখোলা উপজেলার অনেকেরই।২০১৭ সালের পরে শরণখোলাসহ সিডর বিদ্ধস্ত বাগেরহাটের মানুষের উন্নয়নে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা কাজ করেছে। মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থারও পরিবর্তন হয়েছে। টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মানের তবে মূল যে দাবি ছিল তা এখনও বাস্তবায়ন হয়নি। এদিকে যেটুকু বেড়িবাঁধ নির্মান হয়েছে, তাতেও রয়েছে সমস্যা। পানি নিস্কাশনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় শরণখোলা উপজেলা সদরের রায়েন্দা এলাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয় এই বেড়িবাঁধের কারণে। এছাড়া সাউথখালী ইউনিয়নের গাবতলা থেকে বগী পর্যন্ত সোয়া দুই কিলোমিটার বাঁধের নির্মান কাজ এখনও শেষ হয়নি। প্রতিবছরই এই জায়গা থেকে লোকালয় প্লাবিত হয়। প্রাণ হানি না ঘটলেও, প্রচুর পরিমান সম্পদের ক্ষতি হয় স্থানীয়দের।

২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর রাতে ঘূর্ণিঝড় সিডর আঘাত হেনেছিল বাগেরহাটসহ দক্ষিনাঞ্চলের কয়েকটি জেলায়। এতে সরকারি হিসেবে এই ঝড়ে জেলার ৯‘শ ৮ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। তবে স্থানীয়দের দাবি মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি ছিল।সিডরে গাছ পরে বাগেরহাটের সকল রাস্তা ঘাট বন্ধ ছিল। প্রায় একমাস সময় লেগেছিল জেলার সকল রাস্তা স্বাভাবিক করতে।তবে মহাসড়ক ও আঞ্চলিক মহাসড়কগুলো তিনদিনের মধ্যে স্বাভাবিক হজয়েছিল।কয়েকশ কোটি টাকার সম্পদের ক্ষতি হয়েছিল বাগেরহাট বাসীর।