‘সড়ক দুর্ঘটনারোধে আমরা কতটা আন্তরিক ছিলাম’

ইলিয়াস কাঞ্চন, অতিথি লেখক. নিরাপদ সড়ক চাই’র ২৭ বছর উপলক্ষে আজ ১ ডিসেম্বর ‘স্বাধীনতার ৫০ বছরে নিসচার ২৭ বছর: সড়ক দুর্ঘটনারোধে আমরা কতটা আন্তরিক ছিলাম?’ শীর্ষক গোল টেবিল আয়োজনে প্রধান অতিথি মাননীয় সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি, সম্মানিত অতিথিবৃন্দ ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মাননীয় মেয়র আতিকুল ইসলাম, প্রফেসর শামসুল হক, অধ্যাপক-বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, মোঃ এহছানে এলাহী, চেয়ারম্যান- বিআরটিসি, নূর মোহাম্মদ মজুমদার, চেয়ারম্যান-বিআরটিএ, মোঃ ইউছুব আলী, অতিরিক্ত সচিব-সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ডিএমপি) মোঃ আব্দুর রাজ্জাক, নির্বাহী পরিচালক (ডিটিসিএ) খন্দকার রাকিবুর রহমান, নাজমুল হোসাইন, পরিচালক-ব্রাক, ইশতিয়াক রেজা, সিনিয়র সহ-সভাপতি-বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন, মনজিল মোরশেদ, সিনিয়র আইনজীবী-বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, রাশেদা রওনক খান, সহকারী অধ্যাপক (নৃ-বিজ্ঞান বিভাগ)-ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, মিজানুর রহমান খান, যুগ্ম সম্পাদক-দৈনিক প্রথম আলো, শাহিদা সুলতানা, জেলা প্রশাসক ও বিজ্ঞ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (গোপালগঞ্জ) ও মোঃ রুস্তম আলী খান, সাধারণ সম্পাদক-বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতি।  আপনাদের অভিনন্দন ও শুভকামনা।

আপনাদের সমর্থন ও অকুন্ঠ ভালোবাসায় নিরাপদ সড়ক চাই আজ দীর্ঘ ২৭ বছর পার করলো। দেশের ১৮ কোটি মানুষের প্রাণের দাবী এখন নিরাপদ সড়ক বাস্তবায়ন করা।  প্রায় তিন দশক হতে চললো সড়ককে নিরাপদ করার সামাজিক আন্দোলন চালিয়ে আসছে নিসচা। এই যে সামাজিক আন্দোলন তার শুরু থেকেই আমরা চালক-মালিক-যাত্রী-প্রশাসন সকলকে যার যার দায়িত্ব এবং কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন করতে চেয়েছি এবং আজো প্রধানতঃ সেই কাজটিই করে চলেছি।  এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতার আলোকে আমরা এটি স্পষ্টতই বুঝে উঠতে পেরেছি সড়ককে নিরাপদ করার কাজটি অত্যন্ত কঠিন। পরিবহনের সাথে সংশ্লিষ্ট মালিক, প্রশাসন ও যাত্রীদের অধিকাংশই শিক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও নিজ নিজ দায়িত্ব এবং কর্তব্য সম্পর্কে কতটা আন্তরিক সেটাই এখন প্রশ্ন আকারে দেখা দিচ্ছে।  সেখানে সচেতনতা কতটুকু আশা করা যায়। অতএব পরিবহনের সাথে সংশ্লিষ্ট অর্ধশিক্ষিত-অশিক্ষিতদের কাছ থেকে সেই সচেতনতা আশা করা কতটা সমীচিন-তা বোধকরি সকলেরই বোধগম্য হয়ে উঠবে।

যে কারনে প্রশ্ন উঠছে সড়ক দুর্ঘটনা কেন রোধ হচ্ছে না।  ২৭ বছর নিরাপদ সড়ক চাই যে দাবীতে দেশের মানুষকে উদ্ধুব্ধ করেছে সকল স্তরে তার ঢেউ আঁছড়ে পড়েছে। ২০১৮ সালের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন তারই একটি প্রমাণ। কিন্তু সফলতা দেখা যাচ্ছে না।  স্বাধীনতার ৫০ বছর, জাতিসংঘ ঘোষিত ডিকেডের ১০ বছর সবই যেন বিফলে যাচ্ছে।  এতোগুলো সময় আমরা পার করলাম অথচ সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে তার ফলাফল শূন্যই বলা চলে।  ২৫ বছর পাকিস্তানের নির্যাতন থেকে আমরা মুক্ত হতে পারলাম মাত্র ৯ মাসে। ৯ মাসে যদি আমরা নিজেদের এই নির্যাতন থেকে মুক্ত করে স্বাধীনতা অর্জন করতে পারি তাহলে ৫০ বছর পার হতে যাচ্ছে আমরা সড়ক দুর্ঘটনাকে কমিয়ে একটি জায়গায় নিয়ে আসতে বা দাঁড় করাতে পারছি না কেন? কেন হলো না? তাহলে কি আমরা সড়ক দুর্ঘটনা রোধে আন্তরিক নই? আর এই আন্তরিকতার অভাব কোথায়? সেটা কিসে বাঁধা? বাঁধাটা জনগণকে বলা দরকার।  আইন কেনো যথাযথভাবে প্রয়োগ হচ্ছে না? নিয়ম কেন চালু হচ্ছে না? সড়ক দুর্ঘটনা কেন রোধ করতে পারছি না? এত বছর কাজ করার পরেও কোথায় সমস্যা? অর্থনৈতিক সমস্যা? আমরা মনে করি না, অর্থনৈতিক সমস্যা আছে। এ ৫০ বছরে দেশ অনেক দূর এগিয়েছে, অবকাঠামোগত ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে, শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বেড়েছে, দেশে শিল্পোন্নয়ন হয়েছে, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে, সড়ক-মহাসড়কের পরিধি বেড়েছে।  সর্বোপরি দেশ এখন উন্নয়নশীল দেশের কাতারে।  এতকিছু অর্জন যদি আমরা করতে পারি তাহলে সড়ক দুর্ঘটনা কমবে না কেন? কেন এর লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না? এর কারণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে কিছু বিষয়ের প্রতি উদাসীনতা।  এই উদাসীনতার কথা বলতে হচ্ছে আন্তরিকতার অভাব আছে বলে। যেমন, চালকের যথাযথ প্রশিক্ষণের অভাব, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, দূর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, জনগণের অসচেতনতা, পথচারিদের স্বেচ্ছাচারী মনোভাব, মোটর সাইকেল চালকদের বেপরোয়া মনোভাব ও প্রশিক্ষণের অভাব, অনিয়ন্ত্রিত গতি, রাস্তা নির্মাণে ক্রটি, রাজনৈতিক স্বদিচ্ছার অভাব, দুর্বল মনিটরিং, প্রকল্প মূল্যায়ন না করা, আইন ও তার যথারীতি প্রয়োগের অভাব ইত্যাদি ব্যাপকভাবে দীর্ঘদিন ধরে পরিলক্ষিত হচ্ছে।  কিন্তু এসব অব্যবস্থাপনা দূর করার ব্যাপারে বরাবরই ঘাটতি থেকে যাচ্ছে।  ফলে সমস্যা যে তিমিরে থাকার সেই তিমিরেই রয়ে গেছে।

প্রসঙ্গত স্বাধীনতার এই ৫০ বছরে শুধু যে সরকারি পর্যায়ে স্বদিচ্ছার অভাব রয়েছে তা নয়, যারা বিরোধী দলে ছিলেন এবং আছেন তারাও এই সমস্যা নিরসনে যথাযথ ভূমিকা রাখতে পারেননি। তাদের স্বদিচ্ছার অভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। তাহলে কি তারাও চায় না সড়ক দুর্ঘটনা রোধ হোক? কেন চায় না? অথচ এ স্বাধীনতার পর যে সংবিধান রচিত হয়েছে সে সংবিধানে জনগণের জানমালের অধিকার দেওয়া আছে। যারা জনপ্রতিনিধি, সংসদের প্রতিনিধি, বিরোধী দলের প্রতিনিধি তারা শপথ নিয়েছেন যে, আমাদের জীবনের, জানমালের রক্ষা তারা করবেন।  তারা কতটুকু ভূমিকা রেখেছে? অথচ আমাদের পক্ষ থেকে এই ২৭ বছরে সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে এমন কোন সুপারিশ বাদ রাখিনি যেটা সড়ক দুর্ঘটনারোধে কার্যকর নয়।  আমরা শুরু করেছি, জনগণকে বুঝিয়েছি, সরকারের সাথে থেকে কাজ করতে চেয়েছি কিন্তু নেতৃত্ব দিতে চাই না। আমরা সরকারের সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করতে চাই।  সরকার কেন তা গুরুত্ব দিচ্ছে না বুঝতে পারছি না।

নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) গত ২৭ বছর ধরে জনসচেতনতা তৈরীতে যে সকল কার্যক্রম করেছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম হল- দেশব্যাপী র‍্যালী, মানববন্ধন, সেমিনার, চালক প্রশিক্ষণ, শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মশালা (উচ্চ মাধ্যমিক, মাধ্যমিক ও প্রাথমিক), শিক্ষার্থী প্রশিক্ষণ, যাত্রী-পথচারি সমাবেশ, জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ঘোষিত রোড সেফটির বিভিন্ন কর্মসূচি পালন উল্লেখযোগ্য।  প্রত্যেকটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচির জন্য নিসচা নির্মিত তথ্যচিত্র, শিক্ষণীয় প্রামান্যচিত্র, নাটক, স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, লিফলেট, স্টীকার, পোস্টার প্রদর্শণ ও সরবরাহ করা হয়ে থাকে।  স্কুল শিক্ষার্থী প্রশিক্ষণের বিশেষ তথ্যচিত্রও নির্মাণ করা আছে, যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বিশেষভাবে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। নিসচা ড্রাইভিং ও মেকানিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করে এসএসসি পাশ দরিদ্র বেকার শ্রেনীকে বিনা ফিতে প্রশিক্ষণ প্রদান করে ড্রা্ইভিং লাইসেন্স প্রদানের মাধ্যমে ২০১০ সাল হতে শিক্ষিত চালক তৈরি করা হচ্ছে।

লক্ষ্য অর্জনে ধৈর্য্য, শ্রম, কঠোর মনোবল ও অপেক্ষার বিকল্প নেই। আমরা হতাশ নই, ভাল কোন কিছু অর্জনে বাধা তো আসবেই। একটু পেছনেই ফিরলে দেখা যায় অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা, প্রতিক্ষার পর- বিভিন্ন মহলের মতামত, অনেক গবেষণা ও ব্যাপক আকারে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর সবাই পেয়েছে ‘সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮’।  যে প্রক্রিয়াটি ২০১২ সালে শুরু হয়ে ২০১৬ সালে শেষ হয় এবং পরবর্তীতে ২০১৮ সালে গিয়ে আইনটি জাতীয় সংসদে এসে পাশ হয়।  আইনটি পাশ হবার পর মহামান্য রাষ্ট্রপতি গেজেটে স্বাক্ষরও করেন।  কিন্তু আইনটি পাশ হওয়ার ১বছর সময় লেগে গেল প্রয়োগ করতে। তাও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে।  কিন্তু কোন এক অদৃশ্য কারণে আইনটি বারবার হোঁচট খাচ্ছে। যদিও যুগপোযোগী এই সড়ক পরিবহন আইনটি প্রণীত হওয়ার পর পরিবহন সেক্টর থেকেই সাধুবাদ জানানো হয়। কিন্তু আইনটি বাস্তবায়নের পথে সেই তারাই আবার নানা অজুহাতে কালক্ষেপন করতে চাইছে ও বাধার সৃষ্টি করছে।  অথচ আইনটি নিরাপদ সড়ক চাই’র একক প্রচেষ্টায় আসেনি।  এই আইনটি সকল শ্রেণী, পেশা দলমত নির্বিশেষে জনসাধারণসহ সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় অর্জিত একটি আইন। এই আইনটিতে কাউকে এককভাবে দায়ী বা টার্গেট করা হয়নি। বিশেষ করে চালকশ্রেনীকেতো নয়ই। বরং তাদের পেশাগত মর্যাদা বৃদ্ধি, কর্মঘন্টা নির্ধারণ, নিয়োগপত্রসহ গাড়ি চালনায় সঠিক পরিবেশ তৈরির কথাও রয়েছে।  তবুও কেন এই বিরোধিতা, কেন এই আইনকে মেনে না নিতে পারার মানসিকতা?

তবে আমরা মনে করি এই আইনটি বাস্তবায়নে এর বিভিন্ন দিক সরকারের পক্ষ থেকে ব্যাখ্যা করা উচিত ছিলো, সেখানেও ঘাটতি রয়েছে।  এই আইন বাস্তবায়নে সরকারের যে সব স্টেকহোল্ডার রয়েছে তাদেরকে উপযুক্ত করতে প্রশিক্ষণ প্রদান করা দরকার।  যাতে করে তারা যথাযথভাবে আইনটির প্রয়োগ করতে পারে।  কারণ আমরা মনে করি এই আইনটির পরিপূর্ণ বাস্তবায়নে যে পজিটিভ দিকগুলো রয়েছে সেটি ব্যাপকভাবে প্রচারের দরকার ছিলো।  সংশ্লিষ্ট  প্রতিষ্ঠানগুলোকে কারিগরিভাবে সক্ষম করে গড়ে তুলতে হবে।

নতুন সড়ক পরিবহন আইনে পথচারী ও যাত্রীদের শাস্তির আওতায় আনার বিষয়টি পরিস্কার করতে হবে।  তাৎক্ষনিক একটি দুর্ঘটনা ঘটলো, দেখা গেল সেই দুর্ঘটনা কোন পথচারী বা যাত্রীর কারনে সংঘটিত হয়েছে। যেহেতু প্রচলিত অবস্থায় সড়ক দুর্ঘটনা ঘটলে উপস্থিত জনতার ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটে সংশ্লিষ্ট যান অথবা চালক-হেল্পারের উপরে।  অথচ তারা দায়ি নয়।  এক্ষেত্রে প্রশ্ন হলো এখানে শাস্তির বিধানটি কীভাবে প্রয়োগ করা হবে, বিচারের আওতা কি হবে? কারন আমাদের এখানে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে বিচারের ব্যবস্থা রয়েছে।  কিন্তু সব খানে সবসময় এই আদালত কি পরিচালনা সম্ভব? আবার আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরাও সাধারণত মামলা করতে গিয়ে গাড়ির কাগজপত্র কিংবা চালকের লাইসেন্স জব্দ করে মামলা দায়ের করে থাকে। তাহলে পথচারি ও যাত্রীদের ক্ষেত্রে কোন ডকুমেন্টস (দায়বদ্ধতার জন্য) বা এভিডেন্স-এর উপর ভিত্তি করে শাস্তি নির্ধারণ করা হবে। এক্ষেত্রে আসতে পারে জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়পত্র, কিংবা ড্রাইভিং লাইসেন্স (যদি থাকে)।  কিন্তু দেখা যাচ্ছে অনেকের জাতীয় পরিচয়পত্রের ঠিকানা সঠিক নয়, পাসপোর্ট এর মত মূল্যবান জিনিস সচরাচর কেউ বহন করেন না, সকলেই চাকুরিজীবী নন, সকলে গাড়ি চালনা করেন না।  তাহলে দায়বদ্ধতাটি কোথায়? এক্ষেত্রে  বিদেশের প্রসঙ্গ আনা যায়, সেখানে কোন ব্যক্তি অপরাধ করলে তার জাতীয় পরিচয় পত্র জমা ও সকল তথ্য দিতে হয় তখন ঐ ব্যক্তিকে সংশ্লিষ্ট আদালতে গিয়ে জবাব দিতে হয়।  সাধারণত বিদেশে এলাকাভিত্তিক ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট থাকে।  তাছাড়া বিদেশে কেউ ঠিকানা বদল করলে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কাছে অবহিত করে রাখতে হয়। যে কারনে দায়ী ব্যক্তির এ শাস্তি এড়িয়ে যাওয়ার কোন সুযোগ থাকে না। কারন সেখানকার আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদেরও যথাযথ দায়বদ্ধতা রয়েছে।  এখন আমাদের কথা হলো নতুন আইনকে পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করতে হলে এ বিষয়টির দিকে সরকারের নজর দিতে হবে যে বিচারের প্রক্রিয়াটি কীভাবে পরিচালনা করা হবে?

সর্বোপরি এই আইনের কিছু বিষয় পরিষ্কার করতে বিধিমালা প্রণয়ন জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।  আমরা দাবি করবো এই আইনের পরিপূর্ণ বাস্তবায়নে এই বিষয়গুলোর দিকে সরকারের দ্রুত পদক্ষেপ আসবে।  আর তা না হলে আমরা মনে করি, নতুন সড়ক পরিবহন আইনটির প্রয়োগ নিয়ে সংশয় থেকে যাবে। এ আইনের ক্ষেত্রে যদি সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীনতা বা শৈথিল্য এবং মহল বিশেষের অন্যায্য চাপ থেকে যায় তাহলে আমরা দুর্ঘটনামুক্ত বাংলাদেশ, দারিদ্র্যবিমোচন ও এসডিজি বাস্তবায়নের যে স্বপ্ন দেখছি তা আর পূরণ হবে না। পূর্বে যেখানে ছিলাম অর্থাৎ সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল আর অসহায় পরিবারের কান্না চলতেই থাকবে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা মোতাবেক জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নে সড়ক নিরাপত্তা সংক্রান্ত যাবতীয় কর্মকাণ্ড সমন্বয় এবং জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে সড়ক নিরাপত্তা কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাস এবং সড়ক নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতিসাধন করার লক্ষ্যে পূর্বের চলমান কর্মপরিকল্পনার ধারাবাহিকতাসহ  ২০২১-২০২৪ পর্যন্ত কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করতে যাচ্ছে সরকার।  এটা আশার কথা।  কিন্তু আমাদের কথা হচ্ছে এ্যাকশ্যান প্ল্যান যতই নেয়া হোক বা হচ্ছে সেটা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যথাযথ মনিটরিং এর অভাব রয়েছে।  অতীতে দেখা গেছে প্রতিটি পরিকল্পনার কত পারসেন্ট কার্যকর হল বা হয়নি, কেন হয়নি এটার কোন মনিটরিং ব্যবস্থা নেই, যে কারণে বছর শেষে কোন মূল্যায়ন হয় না।  প্রশ্ন হচ্ছে এই মূল্যায়ন কে করবে? কার কাছে জবাবদিহিতা থাকবে তার সুনির্দিষ্ট কোন গাইডলাইন থাকেনা।  ফলে যার যা কাজ সে দায়িত্ব কতটুকু পালন হয়েছে তা জানা সম্ভব হয় না।  অথচ একশ্যান প্ল্যান হয় ঠিকই, কিন্তু বাস্তবায়ন কতটুকু হয়েছে সেটা কেউ জানতেই পারেনা।  যে কারণে গৃহীত পরিকল্পনাগুলো শতভাগ ফলপ্রসূ হয় না। কোন না কোন সমস্যা থেকেই যাচ্ছে।  আমার মনে হয় এখানেও আন্তরিকতা ও দায়িত্বশীলতার অভাব রয়েছে।

আমরা চাচ্ছি আগামী ১০ বছর সরকারের পাশে থেকে কাজ করতে।  সেই সাথে প্রস্তাব থাকবে যে সকল প্রতিষ্ঠান সড়ক দুর্ঘটনা নিরসনে কাজ করে থাকে তাদেরও কাজে লাগানো উচিত।  পরিবহন সেক্টরকে আস্থায় আনতে হলে সকলের সমন্বিত সহযোগিতায় অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও সমন্বিত পরিকল্পনা নিতে হবে।  যে কোন কাজ তখনই সফলতা লাভ করে যখন পারস্পরিক সহযোগিতা এবং ছাড় দেওয়ার মানসিকতা থাকে।  ভয় ভীতি, হুমকি নয় বরং সকলের প্রতি সকলের সহনশীল হতে হবে।  সকলকে সকলের সমস্যাটি বুঝতে হবে, কেউ যদি তার সমস্যা না বুঝে তাহলে সেটি তাকে বুঝাতে হবে।  এখানে ভুল বুঝাবুঝির কোন অবকাশ থাকতে পারেনা।  বিশেষ করে পরিবহন সেক্টরে শৃঙ্খলা জোরদার এবং দুর্ঘটনা নিরসনে সুপারিশ প্রণয়নে গঠিত কমিটি যে ১১১টি সুপারিশ করেছে, তাতে বাস্তবায়নের পথ নির্দেশ রয়েছে যা অচিরেই বাস্তবায়নের কথা ভাবতে হবে।  এসকল সুপারিশমালায় যে শর্ট টাইম, মিড টাইম ও লং টাইম পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের কথা বলা আছে তা ধরে ধরে পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কার্যত সুপারিশমালাগুলো দৃশ্যমান হচ্ছেনা।  এই সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন না করলে নতুন করে ৫ বছরের জন্য যে এ্যাকশ্যান প্ল্যান তৈরি করা হচ্ছে সেটার ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন থেকে যাবে।

সকলকে আন্তরিকতার সাথে বুঝতে হবে সড়ক দুর্ঘটনা একটি জাতীয় সমস্যা।  ভয়াবহ অভিশাপ।  সড়ক দুর্ঘটনার নামে একের পর এক মর্মান্তিক এবং বেদনাদায়কভাবে মানুষ হত্যা চলছে।  চলছে প্রাণ ছিনিয়ে নেবার প্রতিযোগিতা।  এই অবস্থাকে দুর্ঘটনা বা অ্যাক্সিডেন্ট বলা অনুচিত।  যে কারণে আমরা বলি রোড ক্র্যাশ।  এটাও এক ধরণের সন্ত্রাস।  যা ভয়াবহ অপরাধ।  এ অবস্থা থেকে আর সময় ক্ষেপণ না করে জাতিকে মুক্ত করা দরকার।

‘‘পথ যেন হয় শান্তির, মৃত্যুর নয়’’

ইলিয়াস কাঞ্চন, চেয়ারম্যান. নিরাপদ সড়ক চাই।