ঘূর্ণিঝড় ফণীঃ আতঙ্কে বাগেরহাটবাসী

মাসুদুল হক

ঘূর্ণিঝড় ফণীর প্রভাবে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছে উপকূলীয় জেলা বাগেরহাটের মানুষ।ঘরপোড়া গরু সিদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায়, এমন অবস্থা হয়েছে সিডর বিদ্ধস্ত শরণখোলা, মোরেলগঞ্জ ও মোংলা উপজেলা বাসীর।জেলার সর্বত্র ঝড় আতঙ্কে থাকলেও এ তিন উপজেলার মানুষ বেশি বিপদের আশঙ্কা করছেন।মোংলা বন্দর ও বাগেরহাট জেলা ৭ নম্বর বিপদ সংকেত ঘোষনার পর থেকে এ তিন উপজেলার মানুষ নিজেদের জানমাল রক্ষায় ব্যস্ত হয়ে পড়ছে।

এদিকে শরণখোলা উপজেলায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ৩৫/১ পোল্ডারের বিভিন্ন জায়গায় কয়েকশ মিটার ভাঙ্গনের ফলে অনিশ্চয়তায় বসবাস করছে সাউথখালী ইউনিয়নের বগী, উত্তর সাউথখালী, সাতঘর, দক্ষিন সাউথখালী, তাফালবাড়ী ও গাবতলা গ্রামের বাসিন্দারা।

ভেড়িবাঁধের পাশে থাকা শরণখোলা উপজেলার সাতঘর গ্রামের স্বামীহারা তহমিনা বেগম বলেন, দুটি সন্তান নিয়ে বাঁধের পাশে থাকি।ঝড়ের কথা শুনলেই ভয় করে। ঘরের মায়া ছেরে কোথাও যেতে পারিনা। তবে বিপদ সংকেত বৃদ্ধি পেলে জীবন বাঁচাতে আশ্রয় কেন্দ্রে উঠব।

একই এলাকার রহিমা বেগম বলেন, শুনছি এটা সিডরের থেকে ভয়ঙ্কর। এখন মাইয়া পোলা নিয়ে কোথায় যাব, কোথায় থাকব, চিন্তায় পড়েছি।

আব্দুস ছাত্তার হাওলাদার বলেন, বাঁধ ভেঙ্গে এমনিতেই জোয়ারের সময় পানি ওঠে ঘরে। ঝড়ের কথা শুনে খুব আতঙ্কে আছি আমরা।সরকার বাঁধের দিকে নজর দিলে এ এলাকার মানুষ শান্তিতে বসবাস করতে পারত।

অন্যদিকে পাকা ধান, পান, আখ ও সবজি রক্ষার্থে মরণপন চেষ্টা করছেন কৃষকরা।জলচ্ছাসের আশঙ্কায় মৎস্য খামারের পাশে অতিরিক্ত নেটের বেড়া দিয়েছেন মৎস্যচাষীরা।

সদর উপজেলার ভুটে মারি গ্রামের কৃষক আবুল বাশার বলেন, ঝড়ের খবর শুনে সবাই মিলে পাকা ধান কেটে ঘরে তোলার চেষ্টা করছি। বউ ছেলে-মেয়ে সবাই মিলে রাতেও ধান আনতে। তানা হলে কালকের ঝড়ে পাকা ধানে মিই হয়ে যাবে।

শেখ দেলোয়ার হোসেন, ছাব্বির রহমান, ইসরফিল আমিনসহ অনেকে বলেন, এত বড় ঘূর্ণিঝড়ের কথা কখনও শুনিনি। এখন আমাদের জমিতে পাকা ধান, ঘেরে মাছ, ভিটায় সবজি কোনটা রেখে কোনটা রক্ষা করব। সাথে রয়েছে প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা।শুধু এরা নয় এমন আতঙ্কে রয়েছে জেলার সর্বস্তরের মানুষ।

এদিকে ঘূর্ণিঝড় ফণীর জন্য সুন্দরবনের শেলারচর ও কছিখালী টহল ফারির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পার্শ্ববর্তী ফারিতে স্থানান্তর করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল হাসান। তিনি আরও বলেন, তবে সুন্দরবন রক্ষার্থে বনের অভ্যন্তরে আমাদের ৮৩টি অফিসে ৮শতাধিক কর্মকর্তা কর্মচারী রেয়েছেন। তারা অস্ত্র, গোলাবারুদ ও প্রয়োজনীয় ষরঞ্জাম নিয়ে বনের অভ্যন্তরে অবস্থান করবেন।

মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের হারবার মাস্টার নুরুল হুদা জানান,  ঘূর্ণিঝড় ফনী মোকাবেলায় সর্বত্বক প্রস্তুতি গ্রহন করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। বন্দর জেটি ও আউটার এ্যাংকরেজে অবস্থানরত ১৪টি জাহাজ নিরাপদে রয়েছে। পন্যবোঝাই ও খালাসের কাজ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

তবে ফণী মোকাবেলায় সর্বোচ্চ প্রস্তুতি রয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসন দফায় দফায় সভা জেলা সদর ও উপজেলাগুলোতে কন্ট্রোলরুম ও মনিটরিং কমিটি গঠন করা হয়েছে। পাশপাশি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্যসহ জনপ্রতিনিধিদের সাধারণ মানুষদের প্রতি খেয়াল রাখতে বলা হয়েছে।

জেলা প্রশাসক তপন কুমার বিশ্বাস বলেন, ঘূর্ণিঝড় ফণী মোকাবেলায় ২৩৪টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্র এবং সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এসব আশ্রয় কেন্দ্রে প্রায় আড়াই লাখ মানুষ আশ্রয় নিতে পারবেন। জেলা সদরসহ ৯টি উপজেলায় একটি করে কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে এবং ৭৫ টি ইউনিয়নে ৭৫টি মেডিকেল টিম প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সকল সরকারী কর্মকতা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিলসহ রেড ক্রিসেন্ট, ফায়ার সার্ভিস ও বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থার কয়েক শত স্বেচ্ছাসেবকদের প্রস্তুত থাকতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এসবের পাশাপাশি জনসাধারণকে সচেতন করার জন্য জেলার সর্বত্র মাইকিং করা হচ্ছে।