শতবছর বয়সেও সরকারি ভাতা থেকে বঞ্চিত বাগেরহাটের আল্লাদী

নিজস্ব প্রতিবেদক,বাগেরহাট :
পিতা-মাতা খুব আদর করে নাম রেখেছিল আল্লাদী। বংশ পাল, তার পুরো নাম, আল্লাদী রানী পাল। বয়স প্রায় একশ বছর। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া আল্লাদী চোখে দেখে কম, কানেও শোনে কম। সোজা হয়ে হাটতে পারেন না সে। তারপরও জীবীকার তাগিদে প্রতিদিন কাজ করতে হয় তাকে। কিন্তু এ বয়সে সুখ-শান্তি আসেনি আল্লাদীর জীবনে।
বাগেরহাট সদর উপজেলার গোটাপাড়া ইউনিয়নের গাবরখালী গ্রামের পালপাড়ায় স্বামীর বাড়িতে থাকেন আল্লাদী।তিন কন্যা সন্তানের জননী আল্লাদী। দুই মেয়ের বিয়ে হওয়ার পরে আনুমানিক বছর বিশেক আগে মারা গেছে স্বামী নিমাই চন্দ্র পাল।বিশ বছর বয়সী ছোট মেয়ে রাধা রানী পাল কে নিয়ে শুরু হয় আল্লাদীর নতুন জীবন। দারিদ্রতার কষাঘাতে নিজের ছোট মেয়েকে আর বিয়ে দিতে পারেননি। বিবাহিত বড় দুই মেয়ে স্বামী সন্তান নিয়ে ভারতে থাকেন।মায়ের খোজ নেয়ার ফুসরত নাই তাদের।
পালপাড়া আল্লাদীর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, জীর্ণ শীর্ণ অনেক পুরোনো টিনের ছাপড়ার একটি ঘরে থাকেন আল্লাদী। ঘরের কোন বারান্দা নেই। ঘরের ভেতর সামনের দিকে টালি তৈরির জন্য কিছু মাটি রাখা। একপাশে বেশ কিছু জ্বালানি কাঠ, অন্য পাশে রান্না ঘর। ঘরের মেঝে কিছু ফাকা যায়গা, রাত হলে ওই ফাকা যায়গায় পাটি বিছিয়ে মেয়ে রাধাকে নিয়ে পাটি বিছিয়ে রাত্রীযাপন করেন তিনি।
ঘরের সামনে কিছু খালি জায়গায় মাটির তৈরি টালি শুকানোর জন্য ওলট-পালট করে দেন আল্লাদী। আর মেয়ে রাধা ঘর থেকে ঝুড়িতে করে টালিগুলে এনে মায়ের সামনে রেখে যাচ্ছিলেন।সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এভাবে কাজ করে সময় কাটে মা-মেয়ের।তারপরও তিন বেলা ভাত-মাছ খেতে পারেন না তারা। কোনদিন দুই বেলা আবার কোনদিন তিন বেলা অর্ধ পেট খেয়ে জীবন যাপন করতে হয় এমনটি বলছিলেন মেয়ে রাধা।
এত অসহায় হওয়ার পরেও সরকারি কোন সুযোগ সুবিধা জোটেনি বিধবা আল্লাদী ও তার মেয়ের কপালে। তিনশ টাকায় ত্রিশ কেজি চালের একটি কার্ড থাকলেও, মাসে মাসে তিনশ টাকা একসাথে যোগাতে খুব বেগ পেতে হয় তাদের।আর কবে বিধবা ভাতা বা সরকারি সুযোগ সুবিধা পাবেন তা নিয়ে এখন আর ভাবেন না আল্লাদীর মেয়ে রাধা। তার চিন্তা শুধু মাকে কিভাবে তিন বেলা খেতে দিবে।
আল্লাদীর প্রতিবেশি দিলিপ পাল ও হরিপদ পাল বলেন অনেক আগে আল্লাদী রানীর স্বামী মারা গেছে। তারপর থেকে মেয়েকে নিয়ে খেয়ে না খেয়ে দিন কাটে তার। মাটির কাজে এখন আর তেমন পয়সা নেই। দুই মা মেয়ের টাকায় তিন বেলা খাওয়া জোটে না তাদের।
পচাত্তর বছর বয়সি প্রতিবেশী তুলশী রানী পাল বলেন, আল্লাদী রানী দিদির বয়স আমার থেকেও বেশি। সে কাজ করার সামর্থ তার নেই। তারপরও পেটের টানে তার কাজ করতে হয়। সরকার যদি আল্লাদীকে কোন সাহায্য করত তাহলে শেষ বয়সে খেয়ে পড়ে মরতে পারত।
আল্লাদীর মেয়ে রাধা রানী বলেন, মাকে নিয়ে সবসময় খুব কষ্টে থাকি। মা এখন আর আগের মত কাজ করতে পারে না। খুব অসুস্থ্য তারপরও আমাকে সহযোগিতা করেন। মায়ের ঔষধ কিনতে মাসে অনেক টাকা খরচ হয়। এরপর দুজনের খাওয়া। কবে যে একটু গোস্ত খেছি, তা মনে নেই।এত কষ্টের পড়েও আমরা সরকারি কোন সহযোগিতা পাই না। শুধু ত্রিশ কেজি চাল তিনশ টাকা দিয়ে তোলার একটি কার্ড আছে। আমাদের এখান থেকে গোটাপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের যেয়ে ত্রিশ কেজি চাল আনতে তিনশ টাকার সাথে যাতায়েত ভাড়া আরও ১৫০ টাকা লাগে। আমার মা যাতে মরার আগে একটু তিন বেলা ভাত ও ঔষধ খেয়ে মরতে পারেন সরকারের কাছে সেই দাবি জানাই বলে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন রাধা।
আল্লাদী বলেন, শুনেছি সরকার বিধভা ও বয়স্ক ভাতা দেয়। আমার স্বামী মারা গেছে অনেক আগে আমিতো কোনদিন ভাতা পেলাম না। বয়সের কারণে কানে কম শুনি, চোখে কম দেখি, সোজা হয়ে হাঠতে পারিনা। তারপরওকি আমি বয়স্ক ভাতা পাব না। আমার তো জমি-জমাও নেই। ভাল ঘর নেই। একটা ঘরও কি আমি পেতে পারিনা এমন প্রশ্ন করেন আল্লাদি।
গোটাপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ সমশের আলী বলেন, সরকার শতভাগ বিধবা ও বয়স্ক ভাতা দেয়নি। এছাড়া আল্লাদী নামে কেউ কোনদিন আমার কাছে ভাতার জন্য আসেনি।#