শিকদার বাড়ি দূর্গাপূজার সেরা আয়োজন দেখে অভিভূত

মো. শহিদুল ইসলাম.
শেষ মুহুর্তের সেরা আয়োজন দেখে অভিভূত সবুজ বিশ্বাস দম্পতি। চারদিকের সাজ-সজ্জা, তুলির আঁচড়ে নিপুন হাতে তৈরি দেব-দেবীর প্রতিমা দেখে যে কারও মন জুড়ায়। পুকুরের মধ্যে অষ্ট সখীরে নিয়ে কৃষ্ণের নৌকা বিলাশ, প্রতিমার মাধ্যমে মানুষের সৃষ্টির রহস্য তুলে ধরার যে আকর্ষন রয়েছে এই পূজা মন্ডপে শুধু আমাদের নয় আগত সকলেরই ভাল লাগবে বলে বলছিলেন বালিয়াডাঙ্গা থেকে সবুজ বিশ্বাস দম্পতি। সরেজমিনে সকালে পূজা মন্ডপে গিয়ে মন্ডপ দর্শনে আসা একাধিক ভক্তবৃন্দের সাথে কথা হয়।
প্রতিমা তৈরির শ্রমিক বিথেন বাছাড়, সঞ্জিত বাছার ও ইমন বাছার বলেন, ১৮ই বৈশাখ বিজয় দার সাথে এখানে এসেছি। সবাই মিলে খুবই আন্তরিকতার সাথে কাজ করছি। বিশ্রামের তেমন কোন সময় না থাকলেও দেবতাদের কাজ করতে পেরে ভালই লাগছে। আর এত বড় মন্ডপের কাজ এ বাড়িতে ছাড়া অন্য কোথাও করিনি। তাই কাজে কোন ক্লান্তি মনে হয় না।
শিকদার বাড়ি মন্ডপের প্রধান ভাস্কর বিজয় কুমার বাছাড় বলেন, প্রতি বছরের ন্যায় এবছরও আমরা মানুষকে নতুন কিছু দেওয়ার চেষ্টা করব।এবছর ৮০১ প্রতিমার মাধ্যমে সৃষ্টির রহস্য তুলে ধরার চেষ্টা করছি। এর মধ্যে থাকবে মানুষ কিভাবে সৃষ্টি হয়েছে!কার্তিক, গনেষ, নারদ এরা কিভাবে জন্ম নিল, নারায়ন ব্রোহাও রুপ কিভাবে পেল।নারায়ন চক্র পেলেন কিবাবে তা আমরা তুলে ধরেছি। পুকুরের মধ্যে এবার অষ্ট সখি নিয়ে কৃষ্ণের নৌকা বিলাশের প্রতিকৃতি দেখ পাবেন দর্শনার্থীরা। অন্যান্য বারের থেকে এ বছর দর্শকদের আরও বেশি ভাল লাগবে বলে জানান তিনি। চলতি বছরের ১ লা মে (১৮ বৈশাখ) ১৫ জন শ্রমিক নিয়ে ৮০১ প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু করেন প্রধান ভাস্কর বিজয় কৃষ্ণ বাছাড়। সেই থেকে আয়োজনের শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত খুটিনাটি কাজ করে যাচ্ছেন ভাস্করা।


সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দূর্গাপূজা। দূর্গাপূজা উপলক্ষে দেশের হিন্দু ধর্মালম্বীদের মধ্যে যেমন উৎসাহ উদ্দীপনা দেখা যায়, তেমনি অন্য ধর্মাবলম্বীদের মাঝেও উৎসবের আমেজ লক্ষ করা যায়। বাংলাদেশের দূর্গাপূজাকে ভিন্ন মাত্রা দেয় বাগেরহাটের শিকদার বাড়ি পূজামন্ডপ। প্রতিবছর প্রতিমার সংখ্যার দিক দিয়ে দেশের সেরা বা বৃহত্তম মন্ডপ তৈরি হয় শিকদার বাড়িতে। ভক্তবৃন্দ এই মন্ডপকে এশিয়া মহাদেশের সবচেয়ে বড় মন্ডপ বলে দাবি করেন। এ বছরও তার ব্যতিক্রম নয়। ৮০১ টি প্রতিমা নিয়ে দেশের সব থেকে বড় আয়োজন করছে শিকদার বাড়ি পূজা মন্ডপ। সারা বছরই বড় আয়োজন নিয়ে থাকে শিকদার বাড়ির নানা প্রস্তুতি।
আগামী ৪ অক্টোবর মহালয়ার মধ্যে দিয়ে শারদীয় দূর্গোৎসবের শুভ সূচনা হবে। দেবীদূর্গা এবছর ঘোড়ায় চড়ে আসবেন আর যাবেনও ঘোড়ায় । ৪ অক্টোবর থেকে ৮ অক্টোবর দূর্গাপূজা চলবে।


পুজা মন্ডপে রয়েছে অতিথিদের আগমনের প্যান্ডেল ও সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার জন্য মঞ্চের সাজসজ্জা। এ কাজে নিয়োজিত রয়েছেন দক্ষিনাঞ্চলের বিখ্যাত মাগুরার বৈশাখী ডেকারেশন। সাজসজ্জা বিভাগের প্রধান আব্দুল কুদ্দুস বলেন, প্রায় সাড়ে ৫ মাস ধরে ১৫ জন শ্রমিক কাজ করছি এ মন্ডপের বাহ্যিক সাজসজ্জার কাজ। আশাকরি গেল বছরের তুলনায় দর্শনার্থীরা প্রতিমার পাশাপাশি সাজসজ্জা দেখেও মুগ্ধ হবেন।
এ মন্ডপে থাকছে চোখ ধাঁধানো আলোক সজ্জা, ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা, প্রতিদিন সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা, দর্শনার্থীদের আপ্যায়ন, সরকারি নিরাপত্তার ব্যবস্থার পাশপাশি নিজস্ব নিরাপত্তার ব্যবস্থাসহ নানা আয়োজন। এ মন্ডপকে ঘিরে পূজার পাঁচ দিন হাকিমপুর যেন উৎসবের নগরীতে পরিনত হয়। দেশ বিদেশের অগনিত ভক্ত ও দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখরিত হয় হাকিমপুর।


বাগেরহাট সদর উপজেলার খানপুর ইউনিয়নের হাকিমপুর গ্রামের সিকদারবাড়িতে ২০১১ সালে ২৫১ প্রতিমা নিয়ে যাত্রা শুরু হয় এ মন্ডপের। প্রতি বছরই বৃদ্ধি পেতে থাকে প্রতিমার সংখ্যা। এর ধারাবাহিকতায় ২০১৬ সালে প্রতিমার সংখ্যা ছিল ৬৫১টি। ২০১৭ সালে তা পৌছায় ৭০১ টিতে।
আয়োজক বিশিষ্ট ব্যবসায়ী লিটন শিকদার বলেন, আপনারা জানেন এবছর আমার বাবা মারা গেছেন। বাবার ইচ্ছে ছিল গেল বছরের থেকে ১‘শ প্রতিমা বেশি করা হোক, সেই অনুযায়ী বাড়িয়ে এবছর ৮০১টি প্রতিমার মাধ্যমে আমরা সৃষ্টির রহস্য তুলে ধরার চেষ্টা করছি। এবছর দর্শনার্থীরা অন্যান্য বছরের থেকে ব্যতিক্রম ধর্মী দেবদেবীদের প্রতিমা দেখে দর্শনার্থীরা মুগ্ধ হবেন।
বাগেরহাট পুলিশ সুপার পঙ্কজ চন্দ্র রায় বলেন, বাগেরহাটের প্রত্যেকটি মন্ডপের নিরাপত্তায় পুলিশ সদস্যারা দায়িত্বে থাকবেন। তবে শিকদার বাড়িতে সারদীয় পূজা উৎসবের বড় আয়োজনের কারণে সেখানে আমরা বিশেষ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করব। যাতে ভক্ত ও দর্শনার্থীরা নিরাপদ ও নির্বিঘেœ পূজা মন্ডপ দর্শন করতে পারেন।