জেলে থেকে বাঘ শিকারী হাবিব, খুজে বের করতে হবে গডফাদারদের

নিজস্ব প্রতিবেদক. বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার সোনাতলা-চরগ্রামের কদম আলী হাওলাদারের ছেলে হাবিব। বাবা জেলে থাকায় ছোট বেলা থেকে সুন্দরবনে ছিল তার যাতায়াত। মূল পেশা জেলে থেকে সরে সুন্দরবনের দস্যুতায় লিপ্ত হন বাবা কদমআলী। এরপর আটক হয়ে কারাবরণ করেন তিনি। জামিনে মুক্তি পেয়ে বাড়িতে থাকেন। গেল চার বছরে আগে মারা যায় কদম আলী। বাবার মত হাবিবও সুন্দরবনে জেলে হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কিন্তু এক পর্যায়ে সেও জড়িয়ে পড়েন বন্যপ্রাণি শিকার চক্রের সাথে। নিজেই হরিণ শিকার শুরু করেন। এলাকায় প্রভাবশালীদের কাছে হরিণের মাংস বিক্রি করতেন তিনি। কথিত রয়েছে বাঘ পাচারকারী চক্রের সাথেও তার যোগাযোগ রয়েছে। তিনি বাঘও হত্যা করেছেন। এসবের পরেও হাবিবের ভাগ্যের কোন বদল হয়নি। আর্থিক অবস্থার পরিবর্তণ হয়নি হাবিবের। সরকারি জমি বন্ধবস্ত নিয়ে টিনের ঘর নির্মান করে বসবাস করেন তিনি। স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়ে তার। এলাকায় জনশ্রুতি রয়েছে বন্য প্রাণি শিকার করলেও তার আর্থিক পরিবর্তণ হয়নি। এখনও দিন আনে দিন খায় হাবিব। বাগেরহাট আদালতের হাজত খানায় কথা হয় হাবিবের সাথে। হাবিব বলেন, ছোট বেলা থেকে বাবার সাথে সুন্দরবনে যেতাম। মাছ ধরতাম। অন্য কোন আয়ের ব্যবস্থা না থাকায় আমরা সবাই বনের উপর নির্ভরশীল ছিলাম। এক পর্যায়ে হরিণ শিকার করে স্থানীয় প্রভাবশালীদের কাছে মাংস বিক্রি শুরু করি। কয়েক বছর এ কাজ করার পরে আইনের ভয়ে আর শিকার করি নেই। তিনি আরও বলেন, আমাদের এলাকায় আরও ২০-২৫টি পার্টি রয়েছে, যারা বন্য প্রাণি শিকার করে। আমাকে পরিকল্পিত ভাবে ফাসিয়েছে তারা। এছাড়া যারা প্রকৃত পক্ষে শিকারের সাথে জড়িত, তাদের আত্মীয়দের সাথে বন বিভাগের কর্মকর্তাদের ভাল সম্পর্ক রয়েছে বলে দাবি করেন হাবিব।

বাঘ শিকারি হাবিবের নেপথ্যে যারা জড়িত রয়েছে তাদেরকে খুজে বের করে আইনের আওতায় আনতে হবে। সুন্দরবনের বন্য প্রাণি নিধন ও বনকে সুরক্ষিত রাখতে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পাচারকারী চক্রের সাথে জড়িতদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। তাহলেই বন্য প্রাণি নিধন কমে আসবে বলে দাবি করেন সেভ দ্যা সুন্দরবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যোন ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম।

তিনি বলেন, সুন্দরবন কেন্দ্রিক বিভিন্ন অপরাধে মাঝে মাঝে এ ধরণের হাবিবরা আইনের আওতায় আসে।আবার একটি নির্দিষ্ট সময় পরে আইনগতভাবেই মুক্তি পায় তারা। কিন্তু হাবিব বা স্থানীয় অপরাধীরা কাদের স্বার্থে দীর্ঘদিন ধরে বাঘ-হরিণসহ বন্য প্রাণি হত্যা করছে তা এখনও অজানা। বাঘের চামড়া, হাড়-গোড়, দাতসহ বিভিন্ন অঙ্গ প্রতঙ্গ চড়া দামে বিক্রি হয়। এগুলো দেশের বাইরে পাঁচার হয়। হাবিব-রা তো সুন্দরবন থেকে বাঘ মেরে-ই শেষ। কিন্তু যাদের মাধ্যমে হাবিব-রা বাঘ হত্যায় উৎসাহ পাচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য দৃশ্যমান কোন উদ্যোগ রয়েছে বলে আমার জানা নেই। যেকোন মূল্যে এদেরকে খুজে বের করার দাবি জানান তিনি।

গেল শুক্রবার রাতে বন অপরাধে করা কয়েকটি মামলার আসামী সুন্দরবন সংলগ্ন শরণখোলা উপজেলার সোনাতলা গ্রামের কদম আলী তালুকদারের ছেলে হাবিব তালুকদার (৫০) ওরফে বাঘ হাবিবকে গ্রেফতার করে পুলিশ। গ্রেফতারের পরেই আলোচনায় আসে বাঘ হাবিবের অপরাধ কর্মকান্ড। বন বিভাগ ও থানা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী বাঘ হাবিবেরর নামে ৯টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে বাঘ হত্যার দায়ে তিনটি, হরিণ হত্যার দায়ে ৫টি এবং বন অপরাধে আরও একটি মামলা রয়েছে। এসব মামলার মধ্যে তিনটি মামলায় ওয়ারেন্ট ছিল হাবিবের নামে। হাবিব গ্রেফতার হওয়ার পরেই এলাকায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। আসলে কতটি বাঘ হত্যা করেছে হাবিব এ বিষয়ে কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারেনি।

তবে বন বিভাগের দাবি সুন্দরবনে রয়েল বেঙ্গল টাইগারসহ বন্য প্রাণি হত্যা ও পাচারের সাথে জড়িত হাবিবের গড ফাদারদের খুজে বের করতে বন বিভাগের ক্রাইম কন্ট্রোল ইউনিট জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।

সোনাতলা গ্রামের ইউপি সদস্য ডালিম হোসেন বলেন, গেল দশ বছর আমি ইউপি সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। আমার জানামতে হাবিব একজন সুন্দরবনের বন্য প্রাণি শিকারি। দীর্ঘদিন ধরে হরিণ শিকার করে এলাকার প্রভাবশালীদের কাছে বিক্রি করে আসছে। তার ছেলে হাসান হাওলাদার ও মেয়ের জামাতা মিরাজ ঘরামী এই শিকারের সাথে জড়িত। তবে দুই এক বছর ধরে শুনেছি হাবিব বাঘও হত্যা করেছে। তবে কি পরিমান বাঘ হত্যা করেছে তা স্পষ্ট করে বলতে পারি না। পুলিশ তাকে ধরার জন্য আমার সহযোগিতাও চেয়েছে। অনেকদিন ধরে হাবিব এলাকা ছাড়া ছিল। মাঝে মধ্যে গোপনে আসত।

সুন্দরবন সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটি, শরণখোলা রেঞ্জের সদস্য ও শরণখোলা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আছাদুজ্জামান মিলন বলেন, বিভিন্ন মাধ্যমে আমরা যেটা শুনেছি সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগারের চামড়া, দাত, হাড়সহ বিভিন্ন অঙ্গ প্রতঙ্গ মধ্যপ্রাচ্যসহ পৃথিবীর ধন্যঢ্য ব্যক্তিরা খুব সখ করে সংগ্রহ করেন। তারা আন্তর্জাতিক পাচারকারী চক্রের মাধ্যমে এগুলো ক্রয় করে থাকেন। এই পাচারকারীদের খুজে বের করা প্রয়োজন।

সুন্দরবন সুরক্ষায় নিয়োজিত কমিউনিটি পেট্রোলিং গ্রুপের (সিপিজি) ভোলা টহল ফাঁড়ি ইউনিটের দলনেতা মো. খলিল জমাদ্দার জানান, গেল দুই বছর আগে সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের লাঠিমারা এলাকায় বনের মধ্যে একটি বঘাকে মৃত ভেবে কাছে গেলে আক্রমনের শিকার হন হাবিব। ভাগ্যক্রমে বাঘের আক্রমন থেকে বেঁচে যায় হাবিব। এর পর থেকে এলাকার মানুষ তাকে বাঘ হাবিব বলে ডাকে।

তিনি আরও বলেন, হাবিব একটু হাবাগোবা ধরণের মানুষ। ও আমার প্রতিবেশী। লোভে পড়ে সে কিছু বন্য প্রাণি শিকার করেছে। কিন্তু আসলে সে কি পরিমান বাঘ ও হরিণ শিকার করেছে তা বলা যায় না। আসলে বনের মধ্য থেকে বাঘ হত্যা খুবই কঠিন কাজ। হাবিবকে আমি অনেকবার বুঝিয়েছি যে বনের কোন প্রাণি শিকার করা যাবে না। এরা আমাদের সম্পদ। এসব কথার মাঝে হাবিব একদিন আমাকে বলেছে সে ৩২টি বাঘ হত্যা করেছে। এরমধ্যে ১৯টি মহিলা। কিন্তু এসব বাঘ হত্যা করে কি করেছে তা কিছু বলেনি হাবিব।

সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মোহাম্মাদ বেলায়েত হোসেন, হাবিব আসলে কতটি বাঘ হত্যা করেছে তা আমাদের জানা নেই। হাবিবের নামে তিনটি বাঘ হত্যার মামলা রয়েছে। মামলার পরেই সুন্দরবনে হাবিবের প্রবেশ নিষেদ্ধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল। হাবিবের মত যারা সুন্দরবনের বন্য প্রাণি হত্যার সাথে জড়িত রয়েছে তাদেরকে আইনের আওতায় আনার জন্য আমাদের জোর প্রচেষ্টা চলছে।

তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে বাঘের প্রত্যেকটি অঙ্গ প্রতঙ্গের উচ্চ মূল্য রয়েছে। যার ফলে একটি আন্তর্জাতিক চক্র বাঘের চামড়াসহ বিভিন্ন অঙ্গ পাচার ও ক্রয় বিক্রয়ের সাথে জড়িত রয়েছে। এই চক্রটি স্থানীয় প্রভাবশালীদের মাধ্যমে বাসিন্দা ও সুন্দরবনের জেলেদের ব্যবহার করে থাকে। আমরা বন বিভাগের ক্রাইম কন্ট্রোল ইউনিটের মাধ্যমে অপরাধীদের খুজে বের করার চেষ্টা করছি।

শরণখোলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইদুর রহমান বলেন, বাঘ হাবিবের নামে শরণখোলা থানায় তিন ওয়ারেন্ট মুলতবি ছিল। তাকে দীর্ঘদিন ধরে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে সোর্সের মাধ্যমে তার অবস্থান শনাক্ত করে আটক করে শনিবার দুপুরে আদালতের মাধ্যমে জেলা কারাগারে পাঠানো হয়েছে।