শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬, ০৯:১৬ অপরাহ্ন
শিরোনামঃ
জরাজীর্ণ গোলপাতার ঘরে ভবিষ্যৎ গড়ার লড়াই: প্রাথমিক বিদ্যালয়ের করুণ দশা বাগেরহাটে ১ লাখ ৮৬ হাজার শিশুকে খাওয়ানো হবে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল    অপপ্রচার ও শিষ্টাচারবহির্ভূত রাজনীতির বিরুদ্ধে বাগেরহাটে যুবদলের প্রতিবাদে মিছিল খুলনায় ৭১ টেলিভিশনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী রামপালে বিএনপি ও অঙ্গসহযোগী সংগঠনের নাশকতা বিরোধী শোডাউন খুলনায় কেকেবিএইউতে নেক্সটজেন রিচার্স ইন্টার্নশিপ প্রোগ্রামের উদ্বোধন নৌবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সৎ বোন ও মাকে ঘরছাড়া করার অভিযোগ বাগেরহাটে মহিষপুরা-খুলনা বাস মালিক সমিতির নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ   বিএনপি সরকারকে অবশ্যই বাংলাদেশে সংস্কার বাস্তবায়ণ করতে হবে-নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বাগেরহাটে বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে সনাকের মানববন্ধন

জরাজীর্ণ গোলপাতার ঘরে ভবিষ্যৎ গড়ার লড়াই: প্রাথমিক বিদ্যালয়ের করুণ দশা

রিপোর্টার- / ৬৬ পড়া হয়েছে
সময়- শনিবার, ২৭ জুন, ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক. বাগেরহাট জেলার মোড়েলগঞ্জ উপজেলার তেলিগাতী ইউনিয়নের অবহেলিত একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ১৯০নং পশ্চিম তেলিগাতী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিদ্যালয়টি বর্তমানে অত্র অঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থার চরম অবহেলার এক জ্বলন্ত প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশজুড়ে শিক্ষার ব্যাপক উন্নয়ন হলেও, ১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যাপীঠে যেন উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি; উল্টো এখানে শিক্ষার আলো নিভে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।

​গোলপাতার ঘরে গোলমেলে শিক্ষা:
​বিদ্যালয়ের মূল ভবনটি দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত থাকার পর ২০২২ সালে নিলামের মাধ্যমে অপসারণ করা হয়। পরবর্তীতে সাময়িক পাঠদান কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ২০২২ সালেই একটি গোলপাতার ঘর নির্মাণ করা হয়। সেই থেকে বিগত কয়েক বছর ধরে এই গোলপাতার জরাজীর্ণ চালাতেই চলছে কোমলমতি শিশুদের পাঠদান।
​সরেজমিনে দেখা যায়, রোদ-বৃষ্টির মধ্যে এই ঘরে বসার কোনো উপায় থাকে না। সামান্য বৃষ্টি হলেই গোলপাতার ফুটো দিয়ে জল পড়ে শিক্ষার্থীদের বই-খাতা ভিজে যায়। বেঞ্চগুলো পানিতে ভেসে যায় এবং মাটির মেঝেতে কাদা জমে একাকার হয়ে পড়ে। এমন এক চরম অসহনীয় ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশের মধ্যেই শতাধিক শিক্ষার্থী তাদের ভবিষ্যৎ গড়ার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।

​বরাদ্দ এলেও কাজ হয়নি: অবহেলার চূড়ান্ত পর্যায়
​বিদ্যালয়ের প্রবেশপথ এবং চারপাশের জরাজীর্ণ ছাউনি দেখলে একে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, বরং পরিত্যক্ত কোনো গোয়াল ঘর বলে ভ্রম হয়। দীর্ঘ দৌড়ঝাঁপ ও আকুতির পর অবশেষে ২০২৫ সালের ১ জুন বিদ্যালয়ের ‘এমাজেন্সি’ পাঠদান কার্যক্রম পরিচালনার জন্য এলজিআরডি-এর আওতায় ৪ লক্ষ টাকা মেরামত বরাদ্দ আসে। সে সময় শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মনে আশা জেগেছিল যে, এবার হয়তো অন্তত গোলপাতার জরাজীর্ণ চালাটি ঠিক হবে এবং শিশুরা একটু ভালো পরিবেশে বসতে পারবে।
​তবে সে আশায় গুড়ে বালি। বরাদ্দ আসার পরেও রহস্যজনক কারণে কোনো কাজই সম্পন্ন হয়নি। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বারবার শিক্ষা অফিস আর এলজিআরডি অফিসে দৌড়াদৌড়ি করলেও শেষ রক্ষা হয়নি। এলজিআরডি ইঞ্জিনিয়ারের সূত্রমতে, শেষ পর্যন্ত সেই ৪ লক্ষ টাকার বরাদ্দটি ফেরত দেওয়া হয়েছে। এই ঘটনায় চরম ক্ষুব্ধ ও হতাশ স্থানীয় অভিভাবক ও এলাকাবাসী। তাদের প্রশ্ন— যেখানে বিদ্যালয়ের এই করুণ দশা, সেখানে বরাদ্দ আসার পরেও কাজ না হয়ে টাকা ফেরত যাওয়ার পেছনে কোন অদৃশ্য শক্তি কাজ করছে?
​ক্ষোভ ও আশঙ্কার মুখে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা
​বিদ্যালয়ের বর্তমান ও সাবেক শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে চরম আক্ষেপ ও হতাশার চিত্র ফুটে উঠেছে।
​ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রোজিনা আক্তার বলেন:
​”২০২৪ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর আমি নিজে বিদ্যালয়ের বর্তমান পরিস্থিতির ছবি ও ভিডিও যুক্ত করে উপজেলা শিক্ষা অফিসার মহোদয়ের নিকট বারবার একাধিক আবেদন জমা দিয়েছি। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনো সুরাহা হয়নি। বর্তমানে এই জরাজীর্ণ ঘরে শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে বর্ষার দিনে পাঠদান সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা ছাড়া উপায় থাকবে না।”
​সাবেক প্রধান শিক্ষক সেখ মুজিবুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন:
​”বিদ্যালয়ের পুরাতন ভবনটি জরাজীর্ণ হওয়ার পর থেকে আমি অনেক চেষ্টা করেও একটি নতুন ভবন আনতে পারিনি। অথচ দেখা যায়, যেখানে ভালো ও উন্নত ভবন রয়েছে সেখানে বারবার নতুন ভবন বরাদ্দ আসে। অনেক বিদ্যালয়ে একাধিক ভবন আছে, আর এই বিদ্যালয়ে পাঠদান পরিচালনার জন্য একটি মানসম্মত ক্লাসরুম পর্যন্ত নেই।”
​সহকারী শিক্ষক এনামুল কবির জানান:
​”২০২০ সালে এই বিদ্যালয়ে যোগদানের পর থেকে আমাদের পাঠদানের ক্ষেত্রে কোনো শিক্ষার্থী বা অভিভাবক অভিযোগ করতে পারবেন না। অনেক অফিসারেরা পরিদর্শন করতে এসে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। আমরা আমাদের শতভাগ দেওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু এমন জরাজীর্ণ গোলপাতার ঘরে মানসম্মত শিক্ষা দেওয়া আসলেই অসম্ভব। বারবার আবেদন করেও আমরা কোনো সমাধান পাচ্ছি না।”
​কোমলমতি শিক্ষার্থী আব্রিতা, মুমিনুল, মরিয়ম ও ফাতেমারা জানায়:
​”বৃষ্টি এলে আমাদের বই-খাতা ভিজে যায়, ক্লাসরুম কাদাকাদা হয়ে যায়। ক্লাসে আমরা বসতে পারি না। আমাদের শিক্ষকরা অনেক ভালো পড়ান। পাশের অনেক বড় স্কুল সুন্দর, আর আমাদের স্কুলটা গোলপাতার।আমরা কি সুন্দর স্কুলে পড়তে পারব না!”

​অভিভাবকদের আক্ষেপ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ
​বিদ্যালয়ের কয়েকজন অভিভাবক আক্ষেপ করে বলেন, “ডিজিটাল এই যুগে এসে একটি সরকারি স্কুল গোলপাতার ঘরে চলে— এটা ভাবতেই হাস্যকর লাগে। শিক্ষা খাতে এতো এতো বরাদ্দের কথা শুনি, কিন্তু আমাদের এই স্কুলটি কেন একটি ভবন পায় না তা আমাদের বোধগম্য নয়। এটা কর্তৃপক্ষের সুনজরের অভাব ছাড়া আর কিছুই নয়।”
​বর্তমানে বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা যেমন দিন দিন ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন, তেমনি শতাধিক শিশুর ভবিষ্যৎ চরম হুমকির মুখে পড়েছে। দ্রুততম সময়ে যদি এখানে একটি নতুন ভবন নির্মাণ করা না যায় এবং সাময়িক পাঠদানের জন্য বিকল্প কোনো মানসম্মত ব্যবস্থা করা না হয়, তবে এই অঞ্চলের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়বে।
​১৯০নং পশ্চিম তেলিগাতী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এই জরাজীর্ণ দশা দূর করতে, কোমলমতি শিশুদের শিক্ষার মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে এবং একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তুলতে সংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ কর্তৃপক্ষের জরুরি ও সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করছেন তেলিগাতীবাসী।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ