শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:২৭ পূর্বাহ্ন
শিরোনামঃ
বাগেরহাটে দুই মোটরসাইকেল ও নসিমনের সাথে ত্রিমুখী সংঘর্ষে ৩ জন নিহত রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে নতুন রেকর্ড ১৩২১ মেগাওয়াট উৎপাদন, যুক্ত হচ্ছে জাতীয় গ্রিডে বাগেরহাটে সেবা গ্রহীতাদের কাছ থেকে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ, অবরুদ্ধ ইউপি প্রশাসক বাগেরহাটে জমি দখলের চেষ্টা ও হয়রানিমূলক মামলার প্রতিবাদে মানববন্ধন ভিডিও নজরে আসতেই দুলিপা পারভীন ও হোসাইনের চিকিৎসার দায়িত্ব নেন ডা. জুবাইদা রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে ৮ দিন বন্ধ থাকার পর দ্বিতীয় ইউনিট চালু ​মোড়েলগঞ্জে মাদকসহ ব্যবসায়ী আটক  ​ বাগেরহাটে বসতবাড়ির তালা ভেঙে মূল্যবান মালামাল ও দলিলপত্র লুটের অভিযোগ সুন্দরবনে তিন মাসের নিষেধাজ্ঞায় ফিরেছে প্রান-প্রকৃতি, কমেছে অপরাধ রামপালে রামপালে বাঁধ ভেঙ্গে দুইশতাধিক ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত, টেকসই বাঁধের দাবিতে এলাকাবাসীর মানববন্ধন

গ্রামে পোড়া গন্ধ : বিশ্বাস ও শেখ গ্রুপের সংঘর্ষে নিহত ১, আহত ২৫ : লুটপাট ও ৪০ বসতবাড়ি অগ্নিসংযোগ

রিপোর্টার- / ২৯৫ পড়া হয়েছে
সময়- শুক্রবার, ২৭ মার্চ, ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক. বাগেরহাটের চিতলমারীতে মধুমতি নদীর চরের জমি ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিশ্বাস গ্রুপ ও শেখ গ্রুপের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষে রাজিব শেখ (২৫) নামের এক যুবক নিহত হয়েছেন। এসময় আহত হয়েছে আরও ২৫ জন। সংঘর্ষ পরবর্তী হামলা, ভাংচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগে অন্তত ৪০টি বাড়িঘর ও দোকান ধ্বংসস্তুপে পরিনত হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত উপজেলার চিংগড়ী গ্রামে এই ঘটনা ঘটে।

পরে পুলিশ, সেনাবাহিনী ও ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে পৌছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। যেকোন সময় আবারও হামলার ঘটনা ঘটতে পারে বলে ধারনা স্থানীয়দের।

শুক্রবার সকালে সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, চিতলমারী-পাটগাতি সড়কের চিংগড়ী ও মচন্দপুর গ্রামের মাঝামাঝি স্থানে সড়কজুড়ে ইটের গুড়ি। এক পাশে চিংগড়ী গ্রামের শেখ বাড়ি অন্যপাশে মচন্দপুর গ্রামের বিশ্বাস বাড়ি। শেখ বাড়িতে ঢুকতেই বাতাসে পোড়াগন্ধ আর চোখের সামনে বসতবাড়ির ধ্বংসাবশেষ। বিভিন্ন স্থান থেকে দল বেধে লোকজন আসছে, প্রতিহিংসার আগুনে পুড়ে যাওয়া বাড়িঘর দেখতে।কারও ঘর পুড়ে ভস্মিভূত হয়ে গেছে। আবার কারও অর্ধাংশ পুড়ে গেছে। অনেকের শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়েছেন। একবেলা খাবারেরও ব্যবস্থা নেই বেশিরভাগ ঘরে। হামলায় নিহত রাজিবের বাড়ির পেছনে দুই ডেক্সিতে সবার জন্য এক সাথে খাবার রান্না হচ্ছে। আর শেখ পরিবারের বেশিরভাগ সদস্য লুট হওয়া সম্পদ ও পুড়ে যাওয়া বাড়ি ঘর হারানোর কষ্টে ঘরের সামনে অসহায় বসে আছেন।পুরে গেছে শেখ বাড়ির মধ্যে থাকা বৈদ্যুতিক খুটিও, বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন এলাকার অনেক পরিবার।

ক্ষতিগ্রস্থদের অভিযোগ, বৃহস্পতিবার বিকেলে আরিফ শেখ নামের এক যুবক চিতলমারী-পাটগাতি সড়ক দিয়ে মোটরসাইকেলে যাচ্ছিল।বিশ্বাস পরিবারের লোকজন ওই যুবককে ফুলকুচি (লোহার সিকের তৈরি এক ধরণের মাছধরা অস্ত্র) দিয়ে আঘাত করে। বিষয়টি জানাজানি হলে শেখ পরিবার ও বিশ্বাস পরিবারের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। সন্ধ্যা নাগাদ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যায়। পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শেখ পরিবারের সদস্যদের নিভৃত করার চেষ্টা করেন। সেই সুযোগে সাইদ বিশ্বাস, সোহাগ মেম্বরের নেতৃত্বে শেখ বাড়িতে হামলা হয়। দুই শতাধিক লোকজন হামলা চালিয়ে অন্তত ৪০টি বাড়িঘর লুট, ভাংচুর, পেট্রোল ও পিচ (বিটুমিন) ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে অনেকের জীবনের শেষ সম্বলটুকু পুড়ে ভস্মিভূত হয়ে গেছে।  ক্ষতিগ্রস্ত লিয়াকত শেখ বলেন, আগুন দিয়ে আমার সব শেষ করে দিয়েছে। কি খাব আর কি করব জানি না। আমার ছেলে বা আমিতো কারও সাথে মারামারি করতে যাইনি, তাহলে আমার ঘর পোড়ালো কেন।  মনোয়ারা বেগম নামের এক নারী বলেন, আমার স্বামী প্যারালাইজড (পক্ষাঘাতগ্রস্থ) বিছানায় শোয়া। মারামারির ভয়ে ছোট ছেলেকে ঢাকায় পাঠিয়েছি, আর বড় ছেলে ভ্যান চালায়। ঋণ করে ৬ মাসের ধান কিনে রাখছিলাম ঘরে। তাও পুড়ে গেছে।কি খাব জানিনা।  আব্দুর গণি শেখের স্ত্রী জয়নব বেগম বলেন, ঘর ঠিক করার জন্য ৫০ হাজার টাকা ঋণ করেছিলাম। তা নিয়ে গেছে। একটা ছাগল ও কয়েকটা হাস ছিল, তাও পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।কিভাবে বাঁচব জানি না।হামলাকারীদের বিচার ও ক্ষতিপূরণ দাবি করেন এই নারী।  ক্ষতিগ্রস্ত মোঃ বাবলু শেখ বলেন, ওরা সবাই অস্ত্র-সস্ত্র নিয়ে একসাথে আসছে, এসে আমাদের বাড়িঘরে আগুন দেওয়া ও মারধর শুরু করেছে। আমরা ঠ্যাকানোর চেষ্টা করেছি। এরমধ্যে পুলিশ আসছে, নুরে আলম দারগা (এসআই ) পুলিশ নিয়ে আমাদের লোকজনকে পিটিয়ে ছত্রভঙ্গ করেছে। আর পুলিশের সামনেই আমাদের বাড়ি ঘরে আগুন দিয়েছে। নুরে আলম দারগা ওদের দিয়ে এসব করিয়েছে। আমার ঘরে ৯ভরি স্বর্ণ ও ৫ লক্ষ টাকার মালামাল নিয়ে গেছে। আর অন্তত ৪০টি ঘরে আগুন দিয়েছে। হামলা থেকে বাদ যায়নি কোটি টাকার ভবনও। দুইতলা দুটি ও একতলা বিশিষ্ট অন্তত ৪টি ভবনে আগুন দেওয়া, ভাংচুর ও লুটপাট করা হয়েছে।  দোতলা ঘরের মালিক ইদ্রিস শেখের ছেলে নুরু শেখ বলেন, আমার দুই ভাই বিদেশে থাকে। অনেক কষ্ট করে দোতলা ঘর করছিলাম। সব শেষ করে দিয়েছে। ঘরে যে মালামাল ছিল, সবলুটে নিয়ে গেছে। আমাদের ঘর থেকে স্বর্ণ ও মালামালসহ অন্তত দেড় কোটি টাকার মালামাল নিয়ে গেছে। সাইদ বিশ্বাস, কালা বিশ্বাস ও সোহাগের নেতৃত্বে এসব হয়েছে।

বিশ্বাস ও শেখ পরিবারের মধ্যে বিরোধের কারণ সম্পর্কে নুরু বলেন, দীর্ঘদিন ধরে মধুমতি চরের জমি দখল নিয়ে আলম শেখের সাথে বিশ্বাস পরিবারের বিরোধ চলে আসছিল। এই বিরোধের জেরে বিশ্বাস পরিবারের সদস্যরা আলম শেখকে হত্যা করে। হত্যার পরেও থামেনি দুই পরিবারের বিরোধ। এই বিরোধে এর আগেও কয়েকবার দুই পক্ষের মধ্যে ছোটখাট সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এই বিরোধে এখন পর্যন্ত তিনজন নিহত হয়েছে। যেকোনমূল্যে এলাকার মানুষের নিরাপত্তার স্বার্থে এই বিরোধের সমাধান করা দরকার বলে জানান তিনি।  এদিকে শুক্রবার দুপুরের দিকে দেখা যায় শেখ পরিবারের সদস্যদের হামলার আশঙ্কায় মচন্দপুর গ্রামের বিশ্বাস বাড়ি থেকে টিভি, ফ্রিজ, খাটসহ বিভিন্ন মূল্যবান মালামাল ভ্যান, নসিমন ও পিকআপে করে আত্মীয় স্বজনের বাড়ি পাঠাচ্ছেন। তাদের দাবি শেখ পরিবারের লোকজন সংগঠিত হচ্ছে, তারা আমাদের বাড়িতে হামলা করবে। আলম শেখ মারাগেলেও এমন হামলা করেছিল।

পান্না বিশ্বাসের স্ত্রী সালমা বেগম বলেন, কয়েক বছর আগে আমার স্বামীকে মেরে পঙ্গু করে দিয়েছে শেখ পরিবারের লোকজন। তাদের ভয়ে আমরা সব মালামাল নিরাপদ স্থানে পাঠাচ্ছি। আমাদের তো বাঁচতে হবে। ওরা হুমকি দিয়েছে, সবকিছু পুড়িয়ে দেবে। আগেরবারও আমাদের সবকিছু পুড়িয়ে দিয়েছিল।  এদিকে হামলা, সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও নিহতের ঘটনায় সৌরভ বিশ্বাস (১৯) নামের একজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। সৌরভ মচন্দপুর গ্রামের সোহেল বিশ্বাসের ছেলে।নিহত রাজিব শেখ চিংগড়ী গ্রামের ফারুক শেখের ছেলে।

বাগেরহাটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মোঃ শামীম হোসেন বলেন, অনেক বসতবাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে এবং রাজিব নামে এক যুবক নিহত ও অনেকে আহত হয়েছেন। নিহত রাজিবের মরদেহ উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এঘটনায় একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ অপরাধিদের গ্রেপ্তার করতে অভিযান শুরু করেছে।  তিনি আরও বলেন, ফের সংঘর্ষ বা অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।  চিতলমারী ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের স্টেশন কর্মকর্তা আব্দুল ওয়াদুদ বলেন, খবর পেয়ে আমরা দ্রুত ঘটনাস্থলে আসি। তবে বাঁধার সম্মূখীন হওয়ায় আগুন নেভানোর কাজ শুরু করতে কিছুটা দেড়ি হয়। আনুমানিক ২০-২৫টি বসতঘর পুড়ে গেছে। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি, চারটি ইউনিট একযোগে কাজ করে ৩ ঘন্টার চেষ্টায় আগুন নেভাতে সক্ষম হই।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ