নিজস্ব প্রতিবেদক. বাগেরহাট সদর উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি জুয়েল হাসান সাদ্দামের স্ত্রী-সন্তান মারা যাওয়ার পরও কেন তাকে প্যারোলে মুক্তি দেয়া হলো না- সেই প্রশ্ন সামাজিক মাধ্যমে নানা তথ্য উঠছে। এছাড়া যথাযথো কর্তৃপক্ষের কাছে নিয়মানুগভাবে আবেদন করা হয়েছিলো কিনা তা নিয়েও। এই ঘটনায় এরইমধ্যে বাগেরহাট এবং যশোর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি নিহত কানিজ সুবর্ণা স্বর্ণালীর পরিবারের সদস্য এবং স্থানীয়দের সঙ্গে কথা হয়েছে এই প্রতিবেদকের। পাশাপাশি চিরনিদ্রায় সাদ্দামের স্ত্রী স্বর্ণালী এবং ৯ মাস বয়সী শিশু সন্তান নাজিম।
জানা গেছে, গত ১৫ ডিসেম্বর সাদ্দামকে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে আনা হয়। এরপর থেকেই তিনি সেখানেই আছেন। তার বিরুদ্ধে অন্তত ৭টি মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
শুক্রবার দুপুরে বাগেরহাট সদর উপজেলার সাবেকডাঙ্গা গ্রামের নিজ বাড়ি থেকে সাদ্দামের স্ত্রী স্বর্ণালীর মরদেহ ঘরের সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার করে পুলিশ। একই ঘরের মেঝে থেকে উদ্ধার করা হয় তার ৯ মাস বয়সী শিশু সন্তান নাজিমের মরদেহ। স্বজনদের কেউ কেউ ধারণা করছেন, মানসিক হতাশা থেকে সন্তানকে হত্যার পর আত্মহত্যা করেন স্বর্ণালী। ঘটনার পর স্ত্রী-সন্তানের লাশ শেষবারের মতো দেখার সুযোগ দিতে পরিবারের পক্ষ থেকে সাদ্দামের প্যারোলে মুক্তির জন্য আবেদন করা হয় বাগেরহাট জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বরাবর। তবে শেষ পর্যন্ত স্ত্রী-সন্তানের দাফনে শরিক হওয়ার অনুমতি মেলেনি সাদ্দামের। এই খবর ছড়িয়ে পড়লে সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই প্রশাসনের সমালোচনা করেন। সাধারণত স্ত্রী মারা গেলে স্বামী প্যারোলে মুক্তি পেয়ে থাকেন। কিন্তু সাদ্দাম হোসেন কেন মুক্তি পেলেন না তার ব্যাখ্যা দিয়েছে বাগেরহাট এবং যশোর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়।
বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন জানান, প্যারোলে মুক্তি সংক্রান্ত একটি আবেদন শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) তার বাংলোতে আসে। বিষয়টি অবগত হওয়ার পর তিনি কারা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
কারা কর্তৃপক্ষ জানায়, সাদ্দাম যেহেতু জেলার বাইরে কারাগারে বন্দি রয়েছেন, তাই প্যারোলে মুক্তি দেয়া তাদের এখতিয়ার বহির্ভূত। ডিসি গোলাম বাতেন জানান, আবেদনকারীদের বিষয়টি জানানো হলে তারা সন্তোষ প্রকাশ করে চলে যান। এরপর এ বিষয়ে আর কোনো যোগাযোগ করা হয়নি।
বাগেরহাট ডিসি তিনি বলেন, প্যারোল সংক্রান্ত বিষয় সাধারণত যে জেলায় বন্দি কারা অন্তরীণ থাকেন সেখানকার জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আবেদন করতে হয়। ২০১৬ সালের সর্বশেষ যে প্যারল নীতিমালা সেখানে ৪ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা আছে যে, যেখানকার কারাগারে আসামি বন্দি থাকবেন সেই কারাগারের সংশ্লিষ্ট জুরিশডিকশনের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বিষয়টি দেখভাল করবেন। এ ঘটনায় রোববার (২৫ জানুয়ারি) যশোর জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কার্যালয় থেকেও ব্যাখ্যা দেয়া হয়। ডিসি কার্যালয়ের মিডিয়া সেল থেকে একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাগেরহাট কারাগার থেকে গত ১৫ ডিসেম্বর যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে আনা হয় জুয়েল হাসান সাদ্দাম নামে এক আসামিকে। বন্দির স্ত্রী ও সন্তান মৃত্যুর ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কিংবা যশোর কেন্দ্রীয় কারাগার কর্তৃপক্ষ বরাবর প্যারোলে মুক্তির কোনো ধরনের আবেদন করা হয়নি। বরং বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে পরিবারের বক্তব্য থেকে জানা যায়, সময় স্বল্পতার কারণে তাদের পারিবারিক সিদ্ধান্তে প্যারোলে মুক্তির আবেদন না করে জেল গেটে মরদেহ দেখানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, আবেদনের পরেও প্যারোলে মুক্তি দেয়া হয়নি, এ ধরনের তথ্যও মিথ্যা; কারণ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বরাবর প্যারোলে মুক্তি সংক্রান্ত কোনো আবেদনই করা হয়নি। বরং পরিবারের মৌখিক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কারা কর্তৃপক্ষ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে মানবিক দিক বিবেচনায় কারা ফটকে মরদেহ দেখানোর ব্যবস্থা করে।
সাদ্দামের মামা মো. হেমায়েত উদ্দিন জানান, গত ২৩ জানুয়ারি বাগেরহাট জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বরাবর প্যারোলে মুক্তির জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত আবেদন করা হয়। জেলা প্রশাসক তাকে বাগেরহাট জেলা কারা কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠান। সেখানে গেলে তাকে জানান হয়, প্যারোলে মুক্তি দেয়ার কোনো এখতিয়ার তাদের নেই। আইন অনুযায়ী যেই কারাগারে আসামি বন্দি আছেন, সেখানেই আবেদন করতে পরামর্শ দেয়া হয়। তিনি বলেন, ‘‘আমরা তাদের (বাগেরহাট কারাকর্তৃপক্ষ) বলেছিলাম যে, আপনাদের যদি কোনো উপায় বা রাস্তা থাকে সেভাবে একটু ব্যবস্থা করেন। তখন জেল সুপার বললেন, ‘আপনারা তাহলে জেলারের কাছে যান।’ আমি মাগরিবের পরপরই জেলারের কাছে গেলাম। তিনি বললেন, ‘আমাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। বাগেরহাট জেলার নয় থানার মধ্যে যেকোনো থানায় হলে আমাদের পক্ষে সম্ভব ছিলো।’’
সাদ্দামের মামা বলেন, ‘তখন আমাদের পরামর্শ দেয়া হলো, আপনারা এই লাশ নিয়ে এখন যশোর গিয়ে দেখা করে আসতে পারেন। পরে আর কোনো উপায় না পেয়ে যশোর কারাগারে মরদেহ নিয়ে গেলে মাত্র পাঁচ মিনিটের জন্য দেখার সুযোগ দেয়া হয়। লাশের সঙ্গে ভেতরে পাঁচ জনকে ঢুকতে দেয়া হয়।
স্বর্ণালীর বাবা শেখ রুহুল আমিন বলেন, ‘আমার দুই ছেলে এবং দুই মেয়ে। এই মেয়েটা অত্যন্ত ভদ্র, কারো সঙ্গে তর্ক পর্যন্ত করতো না। সাদ্দামের সঙ্গে সম্পর্ক করে বিয়ে করে। আমি শুরুতে রাজি ছিলাম না। আমার ছোট ছেলেটা পরবর্তীতে তাদের বিয়ে দেয়। বড় পরিবার হিসেবে ওরাও (সাদ্দামের পরিবার) চেষ্টা করেছে প্রথম অবস্থায় সম্মান দিতে। পরবর্তীতে পারিবারিক কারণে কারো সাথে কথা-বার্তা, ভালো-মন্দ হয়েছে কিনা আমি জানি না।’
তিনি বলেন, ‘আমি কাউকে দোষারোপ করতে চাই না। তবে প্রশাসনের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন হোক। আমার মাকে যদি কেউ হত্যা করে থাকে তাহলে উভয় পরিবারের পক্ষ থেকে এবং এলাকাবাসী এর বিচার চাই।’
ছোট ভাই শাহনাজ আমিন শুভ বলেন, ‘আমার বোনকে সাদ্দামের হাতে তুলে একটা কথা বলেছিলাম, ভাই তুমি আমার বোনকে কোনোদিন কষ্ট দিও না। তার আচরণ কোনোদিন খারাপ পাইনি। সে একটু চড়-মেজাজি কিন্তু তার মধ্য দিয়েও আমার বোনকে যথেষ্ট ভালোবাসতো।’
আমি চাই প্রশাসনের মাধ্যমে তদন্তে বের হোক যে, আসলেই আমার বোনের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে কিনা। আমার ভাগ্নে মারা গেছে, বোন মারা গেছে এটা তো সত্য। কিন্তু আমার বোন কি আমার ভাগ্নেকে মেরেছে? এই পাপের জন্য কে দায়ী সেটা আমার জানার দরকার আছে। আমার বোন এই ঘটনা ঘটাতে পারে না। শুভ বলেন, ‘তাদের বাড়িতে সিসি ক্যামেরা আছে। ওটাতে ভয়েস রেকর্ড হয়। রেকর্ডের মাধ্যমে হয়তো জানা যাবে যে, আসলে কী ঘটনা ঘটেছে।’
আমার বোনের মৃত্যুর পর সোশ্যাল মিডিয়ায় একটা ছবি ছড়িয়েছে যাতে দেখা গেছে যে, চেয়ারটা জায়গায় আছে কিন্তু তার পা খাটের সাথে মিশে আছে। আমার বোন যদি অপরাধ না করে থাকে আমি সেটারও (যে অপরাধী) বিচার চাই।
স্থানীয় এক বৃদ্ধ বলেন, ‘মেয়েটা আর বাচ্চা ছাড়া ঘটনার সময় বাড়িতে কেউ ছিলো না। এখন কীভাবে কী হয়েছে সেটা আল্লাহ ছাড়া আমরা কেউ বলতে পারবো না।’
প্রতিবেশী এক নারী বলেন, ‘আমি আশপাশের সব বাড়িতেই যাই-আসি। তাদের তো ভালো দেখি, ভালো মেয়ে, ভালো বংশ। এই ঘটনা দেখে তো আমাদেরই মাথায় কাজ করছে না যে, সন্তানকে মেরে নিজে গলায় দড়ি দিয়েছে!’
স্বর্ণার শিক্ষক বলেন, ‘আমার ছাত্রী সে। খুব ভালো ছাত্রী ছিলো। ব্যবহার খুব ভালো ছিলো, খুব মিশুক হাস্যজ্জ্বল একটা মেয়ে ছিলো। আমরা চাই, সত্যটা উন্মোচন হোক। সে কি আত্মহত্যা করেছে নাকি তাকে হত্যা করা হয়েছে, নাকি এর পেছনে কোনো কুচক্র আছে আমরা চাই সত্য প্রতিষ্ঠিত হোক।’
বাগেরহাটের পুলিশ সুপার হাছান চৌধুরী বলেন, সংবাদ পাই, এরকম এক বেদনাদায়ক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। সাথে সাথে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার জন্য আমরা নির্দেশনা দিই। আমরা বলেছি যে, প্রতিটা দিক খতিয়ে দেখে আইনগতভাবে এর পেছনের রহস্যটা কী সেটা দেখার জন্য। তিনি জানান, একটা মামলা হয়েছে, ছোট বাচ্চাটার পানিতে ডুবে মৃত্যুর। আর ওই নারীর গলায় ফাঁসের আরেকটা মামলা হয়েছে। পোস্টমর্টেমের ব্যবস্থা হয়েছে যাতে সঠিক বিষয়টা চলে আসে এবং আইনানুগভাবে তদন্তের মাধ্যমে পুরো বিষয়টা যাতে উদঘাটিত হয়।
এদিকে শনিবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে জানাজা শেষে বাগেরহাট সদরের সাবেকডাঙ্গা গ্রামে কারাবন্দি ছাত্রলীগ নেতার স্ত্রী কানিজ সুবর্ণা ওরফে স্বর্ণালী (২২) ও তার ৯ মাস বয়সী শিশুসন্তানকে পাশাপাশি দাফন করা হয়। এসময় পুরো এলাকায় শোক নেমে আসে। গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গোপালগঞ্জ থেকে গ্রেফতার হন সাদ্দাম।