নিজস্ব প্রতিবেদক. প্রায় আড়াই মাস ধরে ভারতের কারাগারে থাকা ১২৮ বাংলাদেশী জেলেকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেছে কোস্টগার্ড পশ্চিম জোন, মোংলা। শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) বিকেলে কোস্টগার্ড পশ্চিম জোন, মোংলা কার্যালয় থেকে তাদের পরিবারের নিকট হস্তান্তর করা হয়। বাংলাদেশ ও ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমঝোতা ও বন্দি বিনিময় চুক্তির অংশ হিসেবে এই জেলেদের বিনিময় করা হয়।দীর্ঘ আড়াই মাস পরে নিজ দেশে ফিরতে পেরে খুশি কারামুক্ত জেলেরা। তবে ভারতীয় কারাগারে অত্যাচার নির্যাতন করেছে বলে অভিযোগ জেলেদের।
কারামুক্ত ১২৮ জেলের মধ্যে কক্সবাজার জেলার মহেশখালী উপজেলার রবিউল আলমের ১২ বছর বয়সী ছেলে তাহমিদুল ইসলামও রয়েছেন। সংসারের অভাব ঘোচাতে চাচাতো ভাইয়ের সাথে সাগরে মাছ ধরতে গিয়েছিলেন। সাগরে যাওয়ার একদিন পরেই ভুলবশত ভারতীয় সীমানায় প্রবেশের অপরাধে অন্যান্য জেলেদের সাথে ওই দেশের নৌবাহিনীর কাছে আটক হয়। প্রায় আড়াই মাস ভারতের কারাগারে থাকার পরে কোস্টগার্ডের সহযোগিতায় দেশে ফিরেছেনে অন্য জেলেদের সাথে। শিশু হলেও, কোন বাড়তি সুবিধা পায়নি সে।কারাগারে অমানসিক নির্যাতন করা হয়েছে তাহমিদকে।
তাহমিদ বলেন, “ভারতীয় বাহিনী আটকের পরে আমাকে মেরে ফেলে দিয়েছিল। আমি অনেক কান্না করেছি, সবাইকে যখন জেলে নিয়ে যায়, আমাকে একটি হোমে রাখে। সেখানেও আমার উপর নির্যাতন করা হয়ছে। বাড়িতে অনেক অভাব তাই মাছ ধরেতে গেছিলাম।”
শুধু তাহমিদ নয়, ভারতের কারাগার থেকে কোস্টগার্ডের সহায়তায় দেশে ফেরা ১২৮ জেলের অভিযোগ একই রকম। তাদেরও নানা ভাবে অত্যাচার করা হয়েছে ভারতীয় জেলে। এমনকি তাদের মুঠোফোন, মাছ ধরা জালসহ মূল্যবান মালামাল রেখে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া ভারতীয় কারাগারে আটক থাকা অন্যান্য জেলেদের ফিরিয়ে আনার দাবি জানান মুক্তি পাওয়া জেলেরা।
মুক্তি পাওয়া আরেক জেলে জাহিদ মোহাম্মাদ সবুজ বলেন, কুয়াশার কারণে আমরা ভারতীয় জলসীমায় প্রবেশ করি। ওই দেশে নৌবাহিনী আমাদের আটক করেই মারধর করে। এরপরে কারাগারে নিয়ে যায়, সেখানেও আমাদেরকে মারধর করেছে কারারক্ষি ও অন্য কারাবন্দিরা। আমাদেরকে ভয় দিয়ে বাড়ি থেকে বিকাশের মাধ্যমে টাকাও নিয়েছে তারা। তারপরও পেট ভরে খেতে দিত না। বাংলাদেশী বলে খুবই ঘৃনার চোখে দেখত।
মোঃ ফয়সাল নামের আরেক জেলে বলেন, আমাদের মাছধরা জাল, মোবাইল সবই রেখে দিয়েছে। কিচু কিচু দিয়েছে, যেসবের দাম কম। আর আমরা যে কারাগারে ছিলাম, বাংলাদেশী আরও ৪২ জন বন্দি আছে, তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের কাছে আবেদন করেন কারামুক্ত এই জেলে।
কোস্টগার্ড সূত্রে জানাযায়, বাংলাদেশ জলসীমার মধ্যে অবৈধভাবে মৎস্য আহরণরত অবস্থায় বাংলাদেশ নৌবাহিনী গত ১৮ এবং ২৩ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে ২ টি ভারতীয় ফিশিং বোট ও ২৩ জন জেলেসহ আটক করে। অপরদিকে, গত ১৬, ১৭, ১৯ এবং ৩০ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে ভারতীয় জলসীমায় মৎস্য আহরণের অভিযোগে ৫ টি বাংলাদেশী ফিশিং বোটসহ ১২৮ জন জেলেকে আটক করে ভারতীয় কোস্ট গার্ড। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে দ্বিপাক্ষিক সমঝোতার মাধ্যমে আটক থাকা জেলেদের বন্দি বিনিময়ের সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়। ২৯ জানুয়ারি বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড এর তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশ-ভারত আন্তর্জাতিক মেরিটাইম বাউন্ডারি লাইন (IMBL) এ বাংলাদেশে আটক থাকা ২৩ জন ভারতীয় জেলেকে ২ টি ফিশিং বোটসহ ভারতীয় কোস্ট গার্ড এর নিকট হস্তান্তর করা হয়। একইসাথে ভারতে আটক থাকা ১২৮ জন বাংলাদেশী জেলেসহ ৫ টি ফিশিং বোট বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড গ্রহণ করে। মুক্তি পাওয়া জেলেদের বাড়ি কক্সবাজার জেলের বিভিন্ন উপজেলায়।
কোস্টগার্ড পশ্চিম জোন, মোংলারে জোনাল কমান্ডার ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ মেসবাউল ইসলাম বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমঝোতায় বাংলাদেশ ও ভারতীয় কোস্ট গার্ডের তত্ত্বাবধানে দু-দেশের আটককৃত জেলেদের বন্দি বিনিময় পরবর্তী বাংলাদেশী জেলেদের পরিবারের নিকট হস্তান্তর করা হয়েছে।
আর জেলেদের উদ্দেশ্যে কোস্টগার্ডের এই শীর্স কর্মকর্তা বলেন, নিরাপত্তার স্বার্থে সমুদ্র মাছ ধরার ক্ষেত্রে আরও বেশি সতর্ক হতে হবে। আর কোন ভাইবে ভারতীয় জলসীমায় প্রবেশ করা যাবে না। আমাদের নিজস্ব যে জলসীমা রয়েছে সেখানে অনেক মাছ আছে সেই মাছ ধরার অনুরোধ করেন তিনি। এছাড়া ভারতীয় জেলেরা বাংলাদেশী জলসীমায় প্রবেশ করলে ব্যবস্থা গ্রহনের আশ্বাস দেন তিনি।
এর আগে গেল বছরের ১০ ডিসেম্বর ভারতের কারাগারে বন্দি থাকা ৩২ জেলেকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে কোস্টগার্ড।