মঙ্গলবার, ১২ মে ২০২৬, ১২:৩০ পূর্বাহ্ন
শিরোনামঃ
মোংলায় ব্যবসায়ীকে উচ্ছেদ করে জমি দখলের অপচেষ্টা, নেপথ্যে প্রভাবশালী মহল বাগেরহাটে বিএনপির নারী নেত্রীদের অবমূল্যায়ন ও হাইব্রিড নেতাদের দৌরাত্ম্যের অভিযোগ বাগেরহাটে ঘের সংক্রান্ত দ্বন্দ্ব : বিএনপির দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা, বিক্ষোভ   হাইকোর্টে তথ্য গোপনের অভিযোগ রামপাল বাইনতলা ইউপির প্যানেল চেয়ারম্যান মনিরা বেগম বরখাস্ত বাগেরহাটে যুবদল নেতা সুজন মোল্লার নামে অপপ্রচার,তদন্তে পুলিশ বাগেরহাটের শরনখোলায় দখলকৃত জমি উদ্ধার, মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানীর অভিযোগে : সংবাদ সম্মেলন  জমি বিরোধের জেরে প্রতিপক্ষের বাড়িতে হামলা,সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভ্রান্ত মূলক তথ্য -পুলিশ সুপার  বাগেরহাটে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস পালিত মোংলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অভ্যন্তরীন সিন্ডিকেট চক্রের প্রভাবে ভোগান্তি চরমে  বাগেরহাটে জুলাই সনদ ও গনভোটের রায় বাস্তবায়নে ১১ দলের বিক্ষোভ 

উপকূল থেকে লন্ডন পর্যন্ত তাঁর শিক্ষার্থীদের পদচিহ্ন

রিপোর্টার- / ৩৯৭ পড়া হয়েছে
সময়- রবিবার, ৫ অক্টোবর, ২০২৫

নিজস্ব প্রতিবেদক,  দেশের ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে যারা তাদের হাতে, তারা অনেক সময় আলোয় আসে না, কিন্তু তাদের আলোয়ই আলোকিত হয় অসংখ্য জীবন। এমনই একজন মানুষ, যিনি প্রান্তিক গ্রামের মাটিতে দাঁড়িয়ে হাজারো শিশুর ভবিষ্যৎ গড়েছেন, তিনি গাজী মোহাম্মদ আলী—রামপালের ২১ চাকশ্রী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক।

৩৮ বছরের শিক্ষকতা জীবনে তিনি প্রমাণ করেছেন, সত্যিকারের শিক্ষকের প্রভাব কোনো সীমানায় থেমে থাকে না। বাগেরহাটের উপকূল থেকে শুরু করে লন্ডনের ক্লাসরুম, বুয়েট থেকে মেডিকেল কলেজ পর্যন্ত—তার শিক্ষার্থীরা আজ ছড়িয়ে আছে দেশ-বিদেশে।

বানতলা ইউনিয়নের বারুইপাড়া গ্রামে ১৯৬৬ সালে জন্ম নেন গাজী আদিল উদ্দিন ও জবেদা বেগমের সন্তান গাজী মোহাম্মদ আলী।
শৈশবেই বুঝে ফেলেছিলেন—জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো জ্ঞান। এই বিশ্বাসই তাঁকে নিয়ে যায় শিক্ষকতার পথে।

১৯৮৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর তিনি শিক্ষকতা শুরু করেন মল্লিকের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে।
তারপর একে একে দুর্গাপুর, পশ্চিম গোবিন্দপুর, গোবিন্দপুর, ফয়লার হাটসহ নানা বিদ্যালয়ে দায়িত্ব পালন করেন নিষ্ঠার সঙ্গে।

শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক সবসময় ছিল আত্মার। তিনি কখনও কেবল পাঠ্যবই পড়াতেন না—বাঁচতে শেখাতেন, স্বপ্ন দেখতে শেখাতেন।

২০০০ সালে গাজী মোহাম্মদ আলী পদোন্নতি পান প্রধান শিক্ষক পদে এবং যোগ দেন প্রসাদনগর ভৈরবডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।এক বছর পর, ২০০১ সালে, তিনি যোগ দেন রামপালের ২১ চাকশ্রী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে—যা হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় অধ্যায়।

গত ২৫ বছর ধরে তিনি এই বিদ্যালয়কে শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং একটি পরিবার হিসেবে গড়ে তুলেছেন।
এখানে শিশুরা যেমন বই শেখে, তেমনই শেখে সততা, সহানুভূতি, আর দায়িত্ববোধ।

তাঁর শিক্ষার্থীরা আজ দেশের নানা প্রান্তে সাফল্যের আলো ছড়াচ্ছে।
ময়মনসিংহ মেডিকেলের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. নাইমা আফরোজ শিমু বলেন,
“স্যার শুধু বই শেখাননি, মানুষ হতে শিখিয়েছেন। তাঁর অনুপ্রেরণা না থাকলে আজ আমি ডাক্তার হতে পারতাম না।”

চাকশ্রী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ফাতেমাতুল জোহরা বলেন,
“আমি স্যারেরই ছাত্রী ছিলাম। এখন তাঁর সঙ্গে একই স্কুলে শিক্ষকতা করি—এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

লন্ডনে ব্যারিস্টারি পড়ছেন শেখ আবুল বাশার। তিনিও আবেগ নিয়ে বলেন,
আমার জীবনের ভিত্তিটা গড়ে দিয়েছিলেন গাজী মোহাম্মদ আলী স্যার। আজ আমি লন্ডনে আছি, কিন্তু প্রতিটি অর্জনের পেছনে তাঁর শিক্ষাই কাজ করছে।

৩৮ বছরের দীর্ঘ পথচলায় তিনি পেয়েছেন দুই শতাধিক পুরস্কার ও স্বীকৃতি। কিন্তু তাঁর চোখে আসল পুরস্কার হলো শিক্ষার্থীদের সাফল্য। তিনি বলেন,আমি সব সময়ই মনে করি, প্রাথমিক শিক্ষা হলো মানুষের জীবনের ভিত্তি। এখান থেকেই মানুষ গড়ে ওঠে। আমরা যদি এই স্তরে শিশুকে ভালোভাবে গড়ে তুলতে পারি, তাহলে দেশ আলোকিত হবে। আজ আমার শিক্ষার্থীরা দেশের বড় বড় জায়গায় কাজ করছে, কেউ বুয়েটে, কেউ কুয়েটে, কেউ বিদেশে ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার—এটাই আমার সার্থকতা।”

চাকশ্রী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে বোঝা যায়—গাজী মোহাম্মদ আলী কেবল প্রশাসনিকভাবে প্রধান শিক্ষক নন, তিনি একজন পরিবারের কর্তা, যিনি প্রতিটি শিশুর সঙ্গে মিশে যান তাদের নিজের মতো করে।
শিক্ষার্থীদের ছোট ভুলেও তিনি রাগ করেন না, বোঝান। তাঁর কাছে শিক্ষা মানে শুধু বই নয়, জীবনচর্চা।

সহকর্মীরা বলেন, তিনি অফিসে আসেন সবার আগে, যান সবার শেষে। কোনো শিক্ষক বা শিক্ষার্থী বিপদে পড়লে সবার আগে পাশে দাঁড়ান তিনিই।

বুয়েট, কুয়েট, ঢাবি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়—দেশের প্রায় সব শীর্ষ প্রতিষ্ঠানে এখন তাঁর প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা রয়েছে। বিদেশে যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, কানাডায়ও কাজ করছেন তাঁর ছাত্রছাত্রীরা।
তাঁর বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা নেওয়া প্রায় দুই শতাধিক প্রাক্তন শিক্ষার্থী এখন শিক্ষক, ডাক্তার, প্রকৌশলী, প্রশাসনিক কর্মকর্তা বা ব্যবসায়ী হিসেবে কাজ করছেন।

২০২৫ সালের ২৪ ডিসেম্বর দীর্ঘ ৩৮ বছরের শিক্ষকতা জীবনের ইতি টানবেন গাজী মোহাম্মদ আলী।
কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া আলোর রেখা থেকে যাবে অসংখ্য মানুষের জীবনে।

সহকর্মী শেখ শরিফুল ইসলাম বলেন, স্যার আমাদের শুধু শিক্ষক নন, তিনি একজন প্রতিষ্ঠান। তাঁর মতো মানুষই প্রমাণ করেন—একজন প্রাথমিক শিক্ষকও পুরো সমাজ বদলে দিতে পারেন।

গাজী মোহাম্মদ আলীর জীবনের গল্প কেবল এক শিক্ষকের পেশাগত সাফল্যের কাহিনি নয়—এটি এক ত্যাগ, ভালোবাসা আর দায়িত্ববোধের ইতিহাস।তিনি প্রমাণ করেছেন, শিক্ষকতা কোনো চাকরি নয়, এটি এক আজীবনের সাধনা।

আজকের শিক্ষক দিবসে তাঁকে সম্মান জানানো মানে, সেই প্রতিটি শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো—যারা নীরবে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গড়ে তুলছেন।

গাজী মোহাম্মদ আলী যখন বলেন, আমরা শিক্ষকরা চাইলে পৃথিবীটাকে আলোকিত করে তুলতে পারি, তখন মনে হয় হ্যাঁ, সত্যিই পারেন। কারণ তাঁর জীবনই তার সবচেয়ে সুন্দর প্রমাণ।

এম,এস/


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ