নিজস্ব প্রতিবেদক. বাগেরহাটে “জলবায়ু ও দুর্যোগ ঝুঁকি অর্থায়ন ও বীমা’ বিষয়ে জেলা পর্যায়ের পরামর্শ ও মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বুধবার (১৯ নভেম্বর) সকালে শহরের দশানী ধানসিঁড়ি হোটেলে মাল্টি এক্টর প্লাটফর্ম (ম্যাপ) অন ক্লাইমেট ডিজাষ্টার রিক্স ফাইন্যান্স এন্ড ইন্সুরেন্স ( সিডিআরএফআই) এর উদ্যোগে সরকারি প্রতিনিধি, স্থানীয় সরকার, উন্নয়ন সংস্থা, যুব প্রতিনিধি, নারী নেত্রী, কৃষক, জেলে ও বিভিন্ন অংশীজন উপস্থিত ছিলেন।
সৈয়দ শওকাত হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন বাগেরহাট কৃষি অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো: মোতাহার হোসেন।
বাগেরহাট ম্যাপের সদস্য সচীব মো: আসাদুজ্জামান শেখ এর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সভায় বক্তারা বলেন, উপকূলীয় বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভয়াবহ ঝুঁকিতে। অতিবৃষ্টি, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড়, স্থায়ী জলাবদ্ধতা, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং কৃষিজমি হারিয়ে যাওয়ার কারণে মানুষের জীবন-জীবিকা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গত পাঁচ দশকে উপকূলে ১ লাখ ২৫ হাজার হেক্টর কৃষিজমি হারিয়ে গেছে এবং বর্তমানে প্রায় ১.২ মিলিয়ন হেক্টর জমি লবণাক্ততার প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত—যা খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীর জীবিকা বদলে যাচ্ছে। জেলে, কৃষক ও দিনমজুর পরিবারগুলো বাধ্য হয়ে পেশা পরিবর্তন করছে। অভ্যন্তরীণ জলবায়ু-জনিত অভিবাসন বাড়ছে, শহরে জনসংখ্যার চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং দারিদ্র্য, পুষ্টিহীনতা ও রোগের প্রকোপ আরও বাড়ছে।

সভায় বক্তারা উল্লেখ করেন, বিশ্বব্যাপী গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনে বাংলাদেশের ভূমিকা অত্যন্ত সীমিত হলেও দেশটি জলবায়ু ঝুঁকিতে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষে। তাই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের স্বার্থ যথাযথভাবে তুলে ধরা জরুরি। সভা শেষে আসন্ন COP30 সম্মেলনে জলবায়ু-সংবেদনশীল দেশগুলোর দাবি বিশ্ববাসীর সামনে শক্তভাবে তুলে ধরার লক্ষ্যে উপস্থিত অংশগ্রহণকারীরা একটি মানববন্ধন করেন। মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, “আমরা আশা করি COP30-এ বাংলাদেশের দাবিগুলো জোরালোভাবে প্রতিফলিত হবে, কারণ উপকূলবাসীর জীবন এখন প্রতিদিনের লড়াই।”COP30–কে সামনে রেখে উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর প্রস্তাবিত ৬ দফা দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে, তহবিলের কার্যকর বাস্তবায়ন : দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসন, পুনর্গঠন ও জীবিকা পুনরুদ্ধারে সরাসরি অর্থায়ন; স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক বিতরণ ব্যবস্থা এবং নারী-প্রধান পরিবার, জেলে, কৃষকসহ সর্বাধিক ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার। প্রবেশযোগ্য ও স্বচ্ছ জলবায়ু অর্থায়ন : স্থানীয় সরকার ও কমিউনিটি-ভিত্তিক সংগঠনের কাছে সরাসরি অর্থ পৌঁছানো, জটিল আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া দূর করা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। অ-অর্থনৈতিক ক্ষতির স্বীকৃতি : মানসিক স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি, স্থানচ্যুতি, সামাজিক বন্ধন—এসবকে জলবায়ু ক্ষতিপূরণের অন্তর্ভুক্ত করা। প্রযুক্তি হস্তান্তর ও নবায়নযোগ্য শক্তির প্রবেশাধিকার : সৌরশক্তি, পানিশোধন প্রযুক্তি, লবণাক্ততা-সহিষ্ণু সমাধান, জলাধার, শক্তি-দক্ষ চুলা, উঁচু শৌচাগার ও নর্দমা ব্যবস্থাপনা গ্রামীণ পর্যায়ে নিশ্চিত করা। লিঙ্গ সমতা ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তি : নারী, যুব ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নেতৃত্ব নিশ্চিত করা; জলবায়ু নীতি ও অর্থায়ন কাঠামোয় সকলের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। জলবায়ু ন্যায়বিচার ও বৈশ্বিক জবাবদিহিতা : উচ্চ-নির্গমনকারী দেশগুলোর যথাযথ জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, প্যারিস চুক্তির বাস্তবায়ন এবং ক্ষতিপূরণ প্রদানে আন্তর্জাতিক দৃঢ়তার দাবি।
আলোচনা সভায় উপস্থিত ছিলেন, প্রেসক্লাবের সভাপতি মোঃ কামরুজ্জামান, সাংবাদিক আলী আকবর টুটুল, বাবুল সারদার, মোঃ নকিব সিরাজুল ইসলাম, আজাদুল হক, ইসরাত জাহান, এস এম রাজ, নকিব মিজানুর রহমান, এস কে এ হাসিব, এডভোকেট মেহেরু নেসা, তসলিমা আক্তার, নারী নেত্রী শাহিদা আক্তার, নারগিস আক্তার লুনা, আশরাফুল ইসলাম মনির, রেশমা আক্তার, সামিয়া আহসানী মৌতুশী, কাকলি জামান, মেঘলা জামান প্রমুখ।
সভায় অংশগ্রহণকারীরা “১.৫ ডিগ্রি লক্ষ্য রক্ষা করা মানবসভ্যতার অস্তিত্ব সুরক্ষার প্রশ্ন। এখনই বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত ও কার্যকর বাস্তবায়ন জরুরি’বলে মন্তব্য করেন।