নিজস্ব প্রতিবেদক. বাগেরহাটের মোংলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অভ্যন্তরীণ নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উঠেছে। হাসপাতালের বিভিন্ন দপ্তরে দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর এখানে সিন্ডিকেট তৈরীর মাধ্যমে প্রভাব বিস্তারের কারণে সাধারণ কর্মীরা অনেকটা অসহায় ও জিম্মি হয়ে পড়েছেন। সম্প্রতি স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গ দলের নেতা কর্মীরা হাসপাতালটিতে সক্রীয় অসাধু সিন্ডিকেট চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচী পালন করেছে।
নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্র জানায়, হাসপাতালটির প্রথম থেকে চতুর্থ শ্রেণির অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী বছরের পর বছর একই কর্মস্থলে থাকার সুযোগে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। এ সিন্ডিকেটের প্রভাবে অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ছে এবং সাধারণ কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ বাড়ছে। বিশেষ করে নার্সদের মধ্যে ইনচার্জ পদ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী সিনিয়র নার্সদের মধ্য থেকে পর্যায়ক্রমে দুই বছরের জন্য একজনকে দায়িত্ব দেওয়ার কথা থাকলেও এখানে দীর্ঘদিন ধরে একই ব্যক্তি বারবার ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে প্রভাবিত করে পদটি ধরে রেখেছেন এবং নিয়মিত নাইট ডিউটিও পালন করেন না। এ নিয়ে কয়েকমাস আগে সিনিয়র নার্সদের মধ্যে অসন্তোস দেখা দিলে ওই ইনচার্জের নাইট ডিউটি করার সিদ্ধান্ত নেয়া হলেও তা রহস্যজনক কারণে এখন পর্যন্ত বাস্তবায়ন করা হয়নি। এসব নিয়ে অন্যান্য সিনিয়র নার্সদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কয়েকজন উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসারের বিরুদ্ধেও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। তারা হাসপাতালের বাইরে ব্যক্তিগত চেম্বার খুলে জটিল বড় বড় রোগের চিকিৎসা দিচ্ছেন, যা তাদের দায়িত্বের আওতায় পড়ে না। অভিযোগ রয়েছে, রোগীদের বিভিন্ন প্যাথলজি পরীক্ষায় পাঠানো ও নির্দিষ্ট ওষুধ লেখার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও ওষুধ কোম্পানি থেকে কমিশন গ্রহণ করছেন তারা। একজন নারী উপ সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসারের বিরুদ্ধে স্থানীয়ভাবে একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সঙ্গে নিজে মালিকানায় জড়িত হয়ে প্রতিদিন রোগী দেখে প্যাথলজি মালিক ও ওষধ কোম্পানীর কাছ থেকে মোটা অংকের কমিশন বাবদ আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
হাসপাতালের হিসাব বিভাগ নিয়েও রয়েছে নানা অভিযোগ। দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত এক হিসাবরক্ষকের বিরুদ্ধে ঘুষ ছাড়া বিল পাস না করা, বিভিন্ন অজুহাতে বিল আটকে রাখা এবং দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। জানা গেছে, সম্প্রতি দুই নার্সের ইনক্রিমেন্ট বিল থেকে তিনি প্রত্যেকের কাছ থেকে এক লাখ টাকা করে ঘুষ নিয়েছেন। এ ছাড়া তিনি শহরতলীর মনপুরা এলাকায় বিশাল অট্রালিকা তৈরী করছেন ও হাসপাতাল এলাকায় একটি ডায়গনষ্টিক প্রতিষ্ঠানের বেনামে কিনে নিয়েছেন। কয়েক মাস আগে তাকে অন্যত্র বদলি করা হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রভাবিত করে সেই আদেশ বাতিল করিয়ে পুনরায় বহাল থাকার অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে গত ৩০ মার্চ বিষপান করা এক রোগীকে ঘিরে কর্তব্যরত চিকিৎসকের সঙ্গে স্বজনদের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। অভিযোগ ওঠে, যথাযথ চিকিৎসা না দেওয়ার কারণে রোগীর অবস্থা অবনতি হয়। পরবর্তীতে বিষয়টি ভিন্ন খাতে নিতে ওই চিকিৎসকের পক্ষ থেকে যুবদল ও ছাত্রদলের কয়েকজন সাবেক নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। এতে দুজন গ্রেফতার হয়ে কারাভোগ করেন। এ ঘটনার প্রতিবাদ এবং হাসপাতালের চলমান অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে গত ২ এপ্রিল স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন। তবে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে বাগেরহাটের সিভিল সার্জন ডা. আ স ম মো. মাহাবুবুল আলম বলেন, “একই নার্সের বছরের পর বছর ইনচার্জের দায়িত্ব পালনের বিষয়টি আমি খতিয়ে দেখব। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তাদের বদলির সুযোগ থাকলেও তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা থাকে। তবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”